ইতিহাস

জাজাবর মোঙ্গল থেকে সুপার পাওয়ার মোঙ্গল

মঙ্গোল ! ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক দাপুটে জাতি । নামটি শুনলেও আজো বহু মানুষের হৃদয়ে তাদের করা ভয়াবহ নৃশংসতা বিভৎসতার কারণে কাঁটা দিয়ে উঠে। পৃথিবী বিস্তৃত এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও এরা মূলত ছিলো সাধারণ এক যাযাবর জাতি । অনেকেই এ জাতিকে চীনাদের একটি শাখা ভেবে থাকলেও মূলত এরা চীনাদের কোন জাত নয়। তূর্কি ও ইরানী রক্তের মিশ্রণ এ মঙ্গোল জাতি । এদের বসবাস মূলত ছিল আধুনিক মঙ্গোলিয়ান অঞ্চলে। গবাদীপশু লালন করে, কৃষিকাজ করে,খাবার সংকটে ভুগলে আশপাশের গোত্র/কাফেলা আক্রমণ করার মাধ্যমে খাবার ছিনিয়ে এনে আর ৮/১০ টা সাধারণ যাযাবর গোষ্ঠীর মতই জীবন ধারণ করে যাচ্ছিল তারা। সাধারণ এক যাযাবর গোষ্ঠী হতে মঙ্গোল জাতির নাটকীয় এ উত্থানের পিছনে মূলত এক ব্যক্তির অভাবনীয় উত্থানকেই চিহ্নিত করা হয়। মঙ্গোলদের উত্থানের ইতিহাস মূলত দ্য গ্রেট খান খ্যাত চেঙ্গিস খানের উত্থানেরই ইতিহাস৷

চিত্রঃমোঙ্গল পতাকা

বলছি ‘দ্য গ্রেট খাঁন’ আওড়ানো কিছু কথা; “হে মানুষ! জেনে রাখ যে, তোমরা মারাত্বক পাপ করেছ৷ যদি এর প্রমাণ চাও, তাহলে বলব আমিই এর প্রমাণ! কারণ আমিই ঈশ্বরের শাস্তি। তোমরা যদি মারাত্বক কোন পাপ না করতে, তাহলে তোমার কাছে ঈশ্বর আমার মত শাস্তি পাঠাতেন না। ” নিজেই নিজেকে ঈশ্বরের শাস্তি আখ্যা দেওয়া ব্যক্তিটি ইতিহাসকে রক্ত দিয়ে ধৌত করতেই যেন ১১৬২ সালে মঙ্গোলিয়ার খেনতি পর্বতমালার বুরখান খালদুন পর্বতের কাছে ওনন নদীর তীরে রক্ত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। মঙ্গোলিয় কিংবদন্তী অনুসারে রক্ত মুষ্টিবদ্ধাবস্থায় জন্মগ্রহণকারী শিশু ভবিষ্যতে বিজেতা রূপে আবির্ভূত হয়। চেঙ্গিস খানকে দুনিয়া চেঙ্গিস খান নামে চিনলেও তার আসল নাম অন্যকিছুই ছিলো। চেঙ্গিস খানের পিতা ইয়েসুগেই তৎকালীন মোঙ্গল গোত্র বোরজিগিন এর গোত্রপ্রধান তথা খান ছিলেন। চেঙ্গিস খানের জন্মের দিন তার পিতা শত্রু তাতার গোত্রকে পরাজিত করে ফিরছিলেন। পরাজিত তাতার শত্রু গোত্রের প্রধানের নাম ছিল তেমুজিন। চেঙ্গিস খানের পিতা জয়ের আনন্দে ছেলের নাম পরাজিত গোত্রপ্রধানের নামেই নামকরণ করেন “তেমুজিন”। শব্দটি মোঙ্গল অর্থ লৌহকার। বাস্তবেই তেমুজিন বাল্যকালেই শিকার, শক্তিমত্তা, কুস্তি, বুদ্ধিমত্তা সকল দিক থেকে তার নামের যথার্থ হয়ে উঠছিলেন।

চিত্রঃবুরখান খালদুন পর্বতমালা

ঘটনাক্রমে বাল্যকালেই তিনি কোরাইট গোত্রের বোর্তের প্রেমে পড়েন যদ্দরুণ ‘বারো’ বছর বয়সেই তাদের বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু মোঙ্গল রিতী অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে বিয়ের বিধিনিষেধ থাকায় বোর্তে তার গোত্রেই থেকে যায়। বিয়ে ঠিক হওয়ার কিছুদিন পর তেমুজিনের বাবার এক তাতার শত্রু উটের দুধের সাথে বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করতে সমর্থ হয়।

ভাগ্য বিপর্যয় যেন সেদিন থেকেই নেমে আসে তেমুজিনের কপালে। মঙ্গোল নেতা ইয়েসুগেই মৃত্যু পরবর্তী নেতা নির্বাচন বৈঠকে দেখা গেল অধিকাংশই বালক তেমুজিনকে তাদের নেতা হিসেবে মেনে নিলেন না। তারা তাদের নিজেদের, পরিবারের নিরাপত্তা,আয়, গবাদিপশুর দায়িত্ব এই অনভিজ্ঞ বালকের হাতে দিতে চাইলেন না। নতুন প্রধান সংকট সম্ভাবনায় তেমুজিনের পুরো পরিবারকে বন্দি করলেন। প্রথম সুযোগেই তেমুজিন তার পরিবারকে নিয়ে জঙ্গলের দিকে পালালেন। শুরু হলো বালক তেমুজিনের ভয়ানক সংগ্রামী জীবন। এরপর সাতটি বছর বনে জঙ্গলে প্রতিনিয়ত লড়াই করে, শিকার করে,শত্রুপক্ষের ধাওয়া মোকাবিলা করে,নিজেকে আরো সুসংহত করার লড়াইয়ে নেমে গেলেন বালক তেমুজিন। নিজ গোত্রকে নিজ আয়ত্বাধীন আনার প্রাণপণ চেষ্টাও করে যেতে লাগলেন। শৈশবের এ প্রতিকূলতাই তাকে তিলে তিলে মজবুত করে গড়ে তুলেছিল। মাত্র তের বছর বয়সে নিজের সৎ ভাইকে হত্যা করে ফেলেন তেমুজিন৷ হত্যার কারণো খুব সামান্য শিকারের খাবার ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া!

১৭ বছর বয়সে নিজ বাল্যবধূ বোর্তেকে নিজ ঘরে নিয়ে আসলেন । কিন্তু এ সংযোগ বেশিদিন স্থায়ী হলো না পিতৃশত্রু মারকিতরা তার অনুপস্থিতিতে তার গোত্র হামলা করল ও বোর্তেকে অপহরণ করে নিয়ে গেল। এমতাবস্থায় তেমুজিন সাহাজ্য চাইলেন পিতৃরক্ত ভাই তুঘরিল খান ও নিজ রক্ত ভাই জমু খাঁর৷ আগেকার দিনের মানুষরা নিজ হাত কেটে রক্ত মিশ্রিত করে রক্ত ভাই বা ব্লাড ব্রাদার বানাত। এরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারা তাকে পরামর্শ দিলেন ধৈর্য্যের সাথে অপেক্ষা করে শক্তি সঞ্চয়ের। বছরখানেক পর নিজ পূর্ণ শক্তি ও মিত্রদের সাথে নিয়ে তিনি বোর্তেকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। বহু নারী গামী চেঙ্গিস খাঁন জীবনে বহু নারীর সংস্পর্শে আসলেও বোর্তেই ছিলো তার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম। তার বহু ঔরসজাত থাকলেও বোর্তের ঔরসজাত সন্তানদেরি তিনি নিজ উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।

চিত্রঃবোর্তে

কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল ধীরে ধীরে তেমুজিন প্রায় মোঙ্গল সকল গোত্রকে নিজ পতাকাতলে নিয়ে আসছিলেন কিন্তু চেঙ্গিস খাঁনের স্বপ্ন ছিলো আরো বৃহদাকার তিনি মোঙ্গল রিতীর বাহিরে যেয়ে নিজ পতাকাতলে মোঙ্গল বংশোদ্ভূত নয় এমন গোষ্ঠীদেরো অন্তর্ভূক্ত করতে লাগলেন দিতে লাগলেন সেনাবাহিনীর উচ্চপদ যার তীব্র বিরোধী ছিলেন তার রক্তের ভাই জমুখা। এছাড়াও জমুখাঁ নিজেও একাধিপত্য চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। একই তালোয়ারের খাপে যেমন দুটি তালোয়ার থাকতে পারেনা তেমনি তেমুজিন আর জমুখাঁর একইসাথে এ দুনিয়াতে শ্বাস নেয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দু’রক্তের ভাই বনে গিয়েছিলেন একে অপরের সবচেয়ে বড় শত্রু। পুরো মঙ্গোল জাতি মূলত তখন দু’ভাগে বিভক্ত টানা দু’চারটি যুদ্ধ জমুখাঁ হারার পর তার জেনারেলরাই তাকে তেমুজিনের হাতে তুলে দেয়।

তেমুজিনের নিকট সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিলো বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি জমুখাঁর জেনারেলদের গরম পানিতে সিদ্ধ করে হত্যার নির্দেশ দেন। এবং পরবর্তীতে জমুখাঁকে তার ইচ্ছানুযায়ী পিঠের হাড় ভেঙ্গে সম্মানের সহিত মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। জমুখাঁর পতন ঘটলে আশপাশের সকল গোত্র আস্তে আস্তে তেমুজিনের পতাকাতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে ১২০৬ সালের আগেই দেখা যায় তেমুজিন সমগ্র মঙ্গোলে একক আধিপত্য বিস্তার করেন। সে বছরই তিনি তার সমগ্র রাজ্য প্রধানদের নিয়ে এক সভায় একত্রিত হোন এবং আধুনিক মঙ্গোলিয়ার আদলে মোঙ্গল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময়ই তেমুজিনকে চেঙ্গিস খাঁন উপাধি দেয়া হয় যার অর্থ করলে দাড়ায় “সার্বজনীন শাসক”।

এরপরের চেঙ্গিস খানের জীবিত একুশ বছরের জীবদ্দশায় তিনি তার নামকে এমন ভাবে প্রমাণ করেছিলেন যদ্দরুনি বোধহয় ইতিহাস তেমুজিন নাম ভুলে গিয়ে চেঙ্গিস খাঁন নামেই তাকে অধিক স্মরণ করে। তার জীবনের বাকি সময়টাকে তার জীবনের স্বর্ণযুগো বলা যেতে পারে। সেখান থেকেই মূলত মঙ্গোলদের উত্থান শুরু সামান্য এক যাযাবর গোষ্টিকে দিয়ে চেঙ্গিস খাঁন আগামী দু’দশকে জয় করেছিলেন প্রায় এক কোটি ৩৫লাখ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল। পদানত করেছিলেন jin,xia,খোয়ারেজম সহ আরো বহু সাম্রাজ্য। হত্যা করেন প্রায় ৪ কোটি মানুষ যা তৎকালীন জনসংখ্যার ১১ শতাংশ। ১২২৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত দেখা যায় কাস্পিয়ান সাগর হতে ইরাক,ইরান, দক্ষিণ রাশিয়া হতে জাপান সাগর পর্যন্ত তার সীমানা বিস্তৃত।

সামান্য এক যাযাবর গোষ্টিকে এক সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করে দিয়ে গিয়েছিলেন চেঙ্গিস খাঁন। নিজে নিরক্ষর হলেও গুণের কদর করতে ঠিকি জানতেন এই মহিয়সী বুঝছিলেন সাম্রাজ্য কেবল তালোয়ারের জোরে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যেকোন রাজ্য জয় করে সে রাজ্য শ্মশানে রূপান্তরিত করে দিলেও শিল্পী, কারিগর,বুদ্ধিজীবীদের কাজের বিনিময়ে জীবনের শর্ততে নিয়ে আসতেন নিজ রাজধানী কারাকোরামে। রক্ত নিয়ে হলি খেললেও খাঁটি সোনার পরখ তিনি ঠিকি জানতেন নিজ শত্রুদের মধ্যেও গুণ দেখলে না হত্যা করে নিজ দলে টেনে আনতেন। তার অন্যতম জেনারেল সোবুতাইও সেরূপই এক প্রতিভা ছিলো শত্রুদলের জেনারেল হলেও তার গুণে প্রভাবান্বিত হয়ে তাকে হত্যা না করে নিজ জেনারেল পদে নিয়োগ দেন চেঙ্গিস খাঁন। মঙ্গোল ভাষা তৈরি করে সে জাতির জন্য তৈরি করেন প্রথম ইয়াসা বা কোড-অব-ল। সে যুগে দ্রুতগামী ঘোড়ার ডাকপ্রথা চালু করেন।নিজে একজন টেংগ্রিস্ট হলেও পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন তার রাজ্যে অন্য কোন ধর্মের মানুষই নিরাপত্তা হীনতায় ভুগত না। ৬০ বছর বয়সেও নিজেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতেন। অবশেষে ১২২৭ সালে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেন এ নৃশংস অভূতপূর্ব বিজেতা।

Genghis Khan as portrayed in a 14th-century Yuan era album; now located in the National Palace Museum, Taipei, Taiwan.

একটি নিরক্ষর পিছিয়ে পড়া বর্বর জাতিকে তুলে দিয়ে গেলেন এক সমৃদ্ধশালী উত্থানে যার উপর ভর করেই এরপর ক্রমান্বয়ে ওগেদাই খাঁন, কোবলাই খানরা মঙ্গোল পতাকা হাতে নিয়ে লিখে যেতে লাগলেন ইতিহাসের পাতায় নিত্য নতুন বর্বতার অধ্যায়৷

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন ( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button