ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় রহস্যময় ভ্যাটিকান সিটি

রহস্যেঘেরা জায়গার প্রতি আগ্রহ আছে কিন্তু ভ্যাটিকান সিটি’র নাম শোনে নি এমন মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে।

ইতালির রোম শহরে, টাইবার নদীর পশ্চিম পাড় ঘেসে এই ছোট্ট দেশটির আয়তন মাত্র ১১০ একর বা ০.৪৪ বর্গ কিলোমিটার। ‘ভ্যাটিকান সিটি’ বিশ্বের অন্যতম ধর্ম খ্রিস্টান ক্যাথলিক দের প্রধান তীর্থস্থান।

প্রাচুর্যময় ইতিহাস আর ঐতিহ্য ছাড়াও রহস্যময় দেশ হিসেবে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে এই ক্ষুদ্র দেশটি।

১৯২৯ সালে, ভ্যাটিকান সিটি কে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু কিভাবে এই ছোট্ট দেশটা বিশ্বের অন্যতম বড় এক ধর্মের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এর পিছনের গল্প টা হাজার বছরের ও পুরাতন। 

পূর্বে, প্রাচীন রোম নগরীর টাইবার নদীর পাড়ঘেরা বর্তমান ভ্যাটিকান সিটির জায়গায় একটি পাহাড় ছিল, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মন্তেস ভ্যাটিকানি’ বা ‘মাউন্ট ভ্যাটিকান’ নামে ডাকা হতো। এই খান থেকেই পরবর্তীতে এই স্থানের নাম ভ্যাটিকান সিটি নামকরণ করা হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর দিকে, আগ্রাপিনা দ্য এল্ডার নিজের আরাম আয়েসের জন্যে ‘মাউন্ট ভ্যাটিকান’ এর কিছু অঞ্চল কেটে বিশাল এক উদ্যান বানান। এর কিছু বছর পর সেই উদ্যানের পাশে বেশ কিছু বসতি গড়ে উঠে এবং ধীরে ধীরে জায়গাটি ঘনবসতি পূর্ণ হয়ে উঠে।

চল্লিশ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে, পরবর্তী সম্রাট আগ্রাপিনা দ্য এল্ডারের ছেলে সম্রাট ক্যালিগুলা উদ্যানের স্থলে সার্কাস বানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলেও শেষ করে যেতে পারেন নি।

কিন্তু তার পরবর্তী সম্রাট নিরো, এই অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করেন। ৫০০ মিটার লম্বা এবং ১০০ মিটার চওড়া এই সার্কাসের নামকরণ করেন ‘গাই সার্কাস দ্য নিরোনেস’, যা নিরোর সার্কাস নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল। 

৬৪ খ্রিস্টাব্দে, পুরো রোম জুড়ে এক বৃহৎ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে যা ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট ফায়ার অফ রোম’ নামে পরিচিতি লাভ করে।  তখন তৎকালীন সম্রাট নিরো সেইন্ট পিটার সহ সকল খ্রিস্টানকে ভ্যাটিকান পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুদন্ডের আয়োজন করেন।

কথিত আছে, সেইন্ট পিটারের শরীরকে উল্টো করে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তার সহচারীগণ সকলকে পুড়িয়ে আর নয়তো ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। তখন খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল হিসেবে ‘ভ্যাটিকান ওবেলিস্ক’ কে ব্যবহার করা হতো। যা বর্তমানে, প্রাচীন ভ্যাটিকানের একমাত্র দৃশ্যমান ভগ্নাবশেষ হিসেবে মনে করে হয়।

৩২৪ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট কন্সট্যান্টাইন ক্ষমতায় আসার পরই ভ্যাটিকান সিটিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। নিরো’র সার্কাসখ্যাত প্রাঙ্গনে সেইন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা নির্মাণ করেন। ধারনা করা হয়, এই ব্যাসিলিকার নীচেই আছে পবিত্র সেইন্ট পিটারের সমাধি। 

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এই ব্যাসিলিকা টা কেবল ভ্যাটিকান সিটি নয়, সারা বিশ্বের খ্রিস্টান ক্যাথলিক দের কাছেই অন্যতম পবিত্র স্থান।

৮৪৬ সালে, সেরাসান জলদস্যুদের আক্রমণে সেইন্ট পিটার ব্যাসিলিকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবার পর পোপ চতুর্থ লিও এই পবিত্র ব্যাসিলিকা এবং এর চারপাশের অঞ্চল রক্ষার জন্য একটি দেয়াল তৈরির নির্দেশ দেন। ৮৫২ সালে ৩৯ ফুট লম্বা এই দেয়ালের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। কিন্তু ১৫০৩ সালে, পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর ১২০০ বছরের পুরনো সেইন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা ভেঙ্গে নতুন করে তৈরির কাজ শুরু করেন। অবশেষে ১৬২৬ সালে,গিয়াসোমো দেল্লা পোর্তা’র তত্ত্ববধানে এই ব্যাসিলিকার কাজ শেষ হয়। কাজ শেষে এর উচ্চতা হয় ৪৫২ ফুট আর আয়তন ছিলো ৫ দশমিক ৭ একর।

কোন পোপ মারা গেলে অথবা অবসরে চলে গেলে এ বিল্ডিং এর ব্যালকনি থেকেই নতুন নির্বাচিত পোপ দেখা দেন।

                                      চিত্রঃ সেইন্ট পিটার’স ব্যাসিলিকা

যদিও রোমান দেবী সিবেল এবং তার স্বামী আটিসের উপাসনা করা হতো বলে খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনের আরো অনেক আগে থেকেই এই জায়গাটিকে পবিত্র স্থান হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে।

১৩০৯ সালে, ফ্রান্সের অ্যাভিগননে পোপের কার্যালয় সরিয়ে নেয়া হলে এর সবই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। 

১৩৭৭ সালে, ক্যাথলিক চার্চ আবার ভ্যাটিকানে ফিরে আসে। 

১৮৭০ সালের আগে ভ্যাটিকান ইতালিরই অংশ ছিলো। কিন্তু মূল ইতালি এবং ভ্যাটিকানে আলাদা শাসনকর্তা বিরাজমান ছিলো। কিন্তু ওই বছর,  ইতালির সরকার দেয়ালঘেরা ভ্যাটিকানের বাইরের সমস্ত অঞ্চল সরকারি সম্পত্তি বলে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার কারণে, চার্চ এবং ইতালির সরকারের মধ্যে  দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

প্রায় ৬০ বছর দ্বন্দ্ব চলমান থাকার পর, অবশেষে ১৯২৯ সালে ইতালির একানায়ক বেনিতো মুসোলিনি রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলের পক্ষে  ‘লাতেরান চুক্তি’র মাধ্যমে ভ্যাটিকান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তবে এর  জন্যে  অন্যান্য পোপীয় রাষ্ট্রীয়সমূহ থেকে দাবি প্রত্যাহার করে নিতে হয় ভ্যাটিকান সিটি কে। এই সময় পোপের মর্যাদা এবং কার্যাবলি ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে ইতালির সরকার  কে প্রায় ৯২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়। এরপর থেকেই বিশ্বের ১.২ বিলিয়ন ক্যাথলিক খ্রিস্টানের প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হবার পাশাপাশি পোপের কার্যালয় এবং বাসস্থান হিসেবে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ভ্যাটিকান। 

শহরের প্রাচীরের মধ্যে থাকা ‘দ্য ভ্যাটিকান প্যালেস’ বা ‘ভ্যাটিকান প্রাসাদ’ টি ই মূলত ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু এবং ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিবেচিত পোপ এর বাসস্থান। 

পোপ নির্বাচনেও তারা বিশেষ আর নিজস্ব ঐতিহ্য অনুকরণ করে থাকেন, যা ‘কনক্লেভ’ নামে পরিচিত।

ভ্যাটিকান সিটির মোট জনসংখ্যা ৮২৫ জন। তাদের রয়েছে ১৩৫ জন নিজস্ব সেনাবাহিনী। যারা ‘সুইস গার্ড’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে “সিটা ডেল ভ্যাটিকানোই” নামে মাত্র ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের রেলওয়ে।

                                                চিত্রঃ সুইস গার্ড

অত্যন্ত প্রাচীন এবং ক্ষুদ্র দেশ হলেও বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি ভ্যাটিকান সিটির রয়েছে নিজস্ব সংবিধান। আছে নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র, নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও, ব্যাংকিং সিস্টেম, টেলিফোন সিস্টেম, পোস্ট অফিস, ফার্মাসি, পত্রিকা ও ফুটবল টিম।

রহস্যেঘেরা এই ছোট্ট দেশটি চোখধাঁধানো স্থাপত্যশিল্পের জন্যে অধিক সুপরিচিত।এখানে রয়েছে ভ্যাটিকান লাইব্রেরি, ভ্যাটিকান মিউজিয়াম, বিখ্যাত চিত্রকর মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর অলঙ্কার করা সিস্টিন চ্যাপেল, রহস্যময় সিক্রেট আর্কাইভ,অ্যাপোলোস্টিক প্যালেস এর মতো বিখ্যাত স্থাপনা।

                                        চিত্রঃ সিস্টিন চ্যাপেল এর ভেতরের অংশ

                                            চিত্রঃ নকশাযুক্ত ভ্যাটিকান লাইব্রেরী 

A Friend in Rome » All you need to know about Vatican tours

                                                  চিত্রঃ ভ্যাটিকান মিউজিয়াম 

                                চিত্রঃ রহস্যময় সিক্রেট আর্কাইভ এর ভেতরের অংশ

প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন পর্যটক আসে এই নগরীতে। সিস্টিন চ্যাপেল এবং পুরো ভ্যাটিকানজুড়েই মাইকেলেঞ্জোলো, রাফায়েল, ভিঞ্চি, বত্তিচেল্লি কিংবা দোনোতেল্লোর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের ফ্রেসকো, ওবেলিস্ক কিংবা ভাষ্কর্য অথবা স্থাপত্যশিল্প একবার স্বচক্ষে দেখবে বলে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button