জীবনী

সৈয়দ আবদুল হাদী, বাংলা গানের কিংবদন্তী!

“একবার যদি কেউ ভালোবাসতো

আমার নয়ন দুটি জলে ভাসতো

আর ভালোবাসতো

এ জীবন তবু কিছু না কিছু পেত”

বাংলাদেশের আধুনিক গানের এক অনন্যা প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। সঙ্গীতে মনোনিবেশ করার পেছনে যে জিনিস টি তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে বলে বলা হয়, সেটা হচ্ছে, তার বাবার শখের গ্রামোফোন। গ্রামোফোন রেকর্ডের গান শুনে ছোটোবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তীব্র ভাবে আকর্ষণবোধ করেন তিনি। সেই থেকেই শুরু হয়েছিলো পথচলা। এর পর নিজেই শুরু করলেন সঙ্গীত চর্চা। টেলিভিশন, বেতার, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অসংখ্য কালজয়ী গান দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এই শিল্পী। সঙ্গীতে অভূতপূর্ব অবদানের জন্যে ৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০০০ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক লাভ করেন এই জনপ্রিয় শিল্পী। 

অনেকেই মনে করেন, সৈয়দ আব্দুল হাদী ১৯৪০ সালের ১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু এ নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, ” আসলে আমার জন্ম আগরতলা। আমার নানার বাড়িতে।আমার বাড়ি কুমিল্লায়। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক। এ কথা প্রচলিত হয়ে গেছে যে, আমার জন্ম কুমিল্লার কসবায়”। তার বাবার নাম সৈয়দ আব্দুল হাই এবং মা মোমেনা খাতুন।

সৈয়দ আব্দুল হাদী’র শিক্ষাজীবন শুরু হয় সিলেটে। কিন্তু পরবর্তীতে চাকরিসূত্রে তার বাবা বদলি হয়ে যাওয়ায় তার নানা বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় এসে তিনি স্কুলে ভর্তি হন।এবং সেখানেই অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। ব্রাহ্মনবাড়িয়া তাই তার কাছে স্মৃতির শহর।

এরপর তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার জন্যে ভর্তি হন।এ নিয়ে রয়েছে একটি মজার ঘটনা। চাকরিসূত্রে তার বাবা তখন রংপুরে। তার বাবা তাকে জানান, কারমাইকেল কলেজ খুব সুন্দর একটা কলেজ।এখানে এসে ভর্তি হলে সাইকেল কিনে দিবেন।সাইকেল এর লোভেই তিনি বাবার কথায় রাজি হয়ে যান। ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজ এ। কিন্তু ৬ মাস যেতেই তিনি রংপুর ছেড়ে ঢাকায় তার চাচার বাসায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজ এ। এখান থেকেই পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “বাংলা” বিভাগে তার স্নাতক অধ্যায় শুরু করেন। পরবর্তীতে লন্ডনের ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সাইন্সে ডিপ্লোমা করেন তিনি।

ছোট বেলা থেকেই গানের প্রতি অনুরাগ থাকলেও, আব্দুল হাদী’র গানের আসর বন্ধুবান্ধব সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। জীবনে প্রথম বারের মতো মঞ্চে গান গেয়েছেন কলেজ এ উঠার পর। ব্রাহ্মনবাড়িয়া কলেজ এর একটি অনুষ্ঠানে প্রথম বারের মতো মঞ্চে গান গেয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। 

১৯৫৮ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন উর্দু সিনেমা ” ইয়ে ভি এক কাহানি” চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মধ্য দিয়েই হয়েছিলো তার সিনেমায় গান গাওয়ার সূচনা। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে, প্রথম বারের মতো বাংলা সিনেমায় গান গাইলেন তিনি। সিনেমার নাম “ডাকবাবু”। এরপর থেকেই আব্দুল হাদী’র নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগলো সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। গেয়ে গেলেন একের পর এক কালজয়ী গান।এক সময় পৌঁছে গেলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। গেয়েছেন ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘এই পৃথিবীর পান্থশালায়’, ‘এমনও তো প্রেম হয়’, ‘কারও আপন হইতে পারলি না’, ‘কেউ কোন দিন আমারে তো’,’জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘আছেন আমার মোক্তার / আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘চোখ বুজিলেই দুনিয়া আধার’, ‘আমি তোমার ই প্রেম ভিক্ষারী’, ‘চক্ষের নজর এমনি কইরা’র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান। শুধু দেশেই নয়।বিদেশেও অনেক মঞ্চে গান গেয়ে দর্শক দের উল্লাসিত করেছেন তিনি।

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে আব্দুল হাদী কর্মজীবনে সঙ্গীতশিল্পী হতে চাননি কখনো। ছেলে বেলা থেকে গানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ বোধ করতেন। গান কে ভালো ও বাসতেন তীব্র রকমের।কিন্তু কর্মজীবনে তিনি হতে চেয়েছিলেন, শিক্ষক। সেই লক্ষ্য থেকেই পড়াশোনা শেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই সঙ্গীতের পোকা এই ব্যক্তিত্ব সঙ্গীত থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারছিলেন না কিছুতেই। তিনি অনুভব করলেন লেকচার দিতে গিয়ে উনার গলার ক্ষতি হচ্ছে। তাই শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে দিয়ে যোগ দিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন এ।কিন্তু সেখানেও উনি লক্ষ্য করলেন, টেলিভিশনে  সময় দিতে গিয়ে উনি সঙ্গীত চর্চার সময় পাচ্ছেন না।তাই এ চাকরি থেকেও অব্যাহতি নেন। এবং পুরোদমে সঙ্গীতেই মনোনিবেশ করেন। বেতারে গাওয়া তার প্রথম জনপ্রিয় গান ‘কিছু বলো, এই নির্জন প্রহরের কণাগুলো হৃদয়মাধুরী দিয়ে ভরে তোলো’।

সৈয়দ আব্দুল হাদী স্বাধীনতা সংগ্রাম এর সময় ও তার গাওয়া গান দিয়ে উদ্যমী করে তুলেছেন আপামর জনতা কে। অন্যান্য অনেক শিল্পীর সঙ্গে অসহযোগ আন্দলোনের সময় “বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ” নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এই সংগঠন এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। এই সংগঠন এর মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ দের সংগ্রামী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন তারা। এছাড়াও আলতাফ মাহমুদ এর সঙ্গে মিলিত হয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্যে গান গেয়েছিলেন অনেকগুলো।

তার গাওয়া দেশাত্মবোধক গান গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গান হচ্ছে, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তে তুমি, যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা ইত্যাদি।

সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্যে সৈয়দ আব্দুল হাদী অর্জন করেছেন অসংখ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা। ২০০০ সালে,সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’ পেয়েছিলেন এই বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক এর জন্যে ১৯৭৮, ১৯৭৯,১৯৮০ টানা এই ৩ বছর সহ মোট ৫ বার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। এছাড়াও এই বছরের জুলাই মাসেই তাকে প্রদান করা হয় ইউরো-সিজেএফবি পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৯। যার মধ্য দিয়ে আজীবন সম্মাননা পান এই গুনী শিল্পী। কিন্তু তিনি মনে করেন, তার সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে তার কাজ দিয়ে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করতে পারা, মানুষের অন্তুরকে স্পর্শ করতে পারা।শুধু গান ই নয়। বাংলাদেশ এর  বিজ্ঞাপনের প্রথম জিঙ্গেল ও করেছিলেন তিনি।

সঙ্গীত চর্চার বাইরেও সৈয়দ আব্দুল হাদী ছিলেন পাবলিক লাইব্রেরীর গুরুত্বপূর্ণ পদ এ। ছোট বেলা থেকেই বই পড়তে প্রচণ্ড রকমের ভালোবাসেন উনি। ইন্টারমিডিয়েট পড়া অবস্থায় ই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে অনেক টাই পরিচিত উনি। ওই বয়সেই ম্যক্সিমগোর্কি, তলস্তয়, পার্ল এস বাক, দস্তয়েভস্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র মতো বিখ্যাত লেখক দের বই উনার নখদর্পনে। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ও সেই স্কুল জীবন থেকেই। লন্ডনের ওয়েলস ইউনিভার্সিটি থেকে ‘গ্রন্থাগার এবং তথ্যবিজ্ঞান’ এ পড়াশোনা শেষ করে এসে উনি পাবলিক লাইব্রেরী তেই কর্মজীবন শুরু করেন। এখানে এসে উনি পাবলিক লাইব্রেরী কে সর্বসাধারনের পড়াশোনা এবং আকর্ষণ এর ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করেছেন। সারাদেশে গণগ্রন্থাগার এর পরিকল্পনা টা উনি ই বাস্তবায়ন করা শুরু করেছিলেন।

সঙ্গীত জগতে বিচরণ করতে সুবল দাস, পি.সি গোমেজ, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ প্রমুখ গান শেখার ক্ষেত্রে সহায়তা ও উৎসাহ যুগিয়েছেন এই কিংবদন্তি কে। 

ব্যাক্তিগত জীবনে সৈয়দ আব্দুল হাদী’র সহধর্মিণী ফখরুন্নাহার তাকে শিল্পী হতে অনেক ভরসা জুগিয়েছেন। এই দম্পতি  ৩ কন্যা সন্তানের জনক। তার কন্যাদের একজন ডাক্তার, একজন আইনজীবী এবং একজন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক। ২০০৯ সালে স্ত্রী’র মৃত্যুর পর অনেক টা ই একা হয়ে পড়েন তিনি।

প্রকৃতির প্রতি অসীম টান এই কিংবদন্তির। পছন্দ করেন বৃষ্টি দেখতে।

আশি বছর বয়সী সৈয়দ আব্দুল হাদী জীবনের ষাট বছর পূর্ণ করেছেন সংগীতাঙ্গনে।জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আগের মতো আর গান গাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। হয়েছেন মৃত্যুর প্রতি অনেক টা সংবেদনশীল। কিন্তু যেই কালজয়ী গান গুলো তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন।সেগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের ভালোবাসা কুড়োবে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button