ইতিহাস

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ‘রাঙ্গামাটি’ পার্বত্য জেলা

‘রাঙ্গামাটি’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি জেলা। অপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারী এই পার্বত্য জেলাটি ২২°২৭’ থেকে  ২৩°৪৪’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°৫৬’ থেকে ৯২°৩৩’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। রাঙ্গামাটি জেলার মোট আয়তন ৬১১৬.১৩ বর্গ কিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।

রাঙামাটি জেলার দক্ষিণে বান্দরবান জেলা, পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলা, উত্তরে ভারত-এর ত্রিপুরা প্রদেশ এবং পূর্বে ভারতের মিজোরাম প্রদেশ ও মিয়ানমার চিন প্রদেশ অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র জেলা, যার সাথে দুই টি দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে- এই দেশ দুটি হলো- ভারত ও মিয়ানমার।

                         চিত্রঃ বাংলাদেশ এর মানচিত্রে ‘রাঙ্গামাটি’ জেলা

জেলা প্রশাসনের পটভূমি 

পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি,  বান্দরবান এই ৩ অঞ্চল নিয়ে গড়ে উঠা একটি বৃহত্তম জেলা। যার পূর্ব নাম ছিলো কার্পাস মহল। ব্রিটিশরা আগমণের পূর্বে কার্পাস মহল ছিল ত্রিপুরা, মুঘল, চাকমা ও আরাকানের রাজাদের যুদ্ধক্ষেত্র। চাকমা রাজা বিজয়গিরি রাজ্য জয় করতে করতে এই অঞ্চল জয় করে নেয় ও রাজ্য স্থাপন করে।

ভৌগোলিক ভাবে হিমালয় অঞ্চলের দক্ষিণে শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত পাহাড়ী এলাকা নিয়ে যে বিশাল অঞ্চল গড়ে উঠেছে, এই জেলা তারই অংশ। 

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে এ অঞ্চলের রাজা যুজা রূপা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজাকে পরাজিত করে রাঙ্গামাটিতে রাজধানী স্থাপন করেন। 

১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে, চাকমা রাজা শের মোস্তা খান মুঘলদেরকে পরাজিত করে এই অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেন এবং শের সাম্রাজ্য বিস্তার করেন।

১৭৬০-৬১ খ্রিস্টাব্দে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলে প্রবেশ করে।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ২০শে জুন প্রশাসনিক সুবিধার জন্য রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।এই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনাতে স্থাপিত হয়। 

১৮৬৭খ্রিস্টাব্দে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে যথোপযুক্ত ভাগকরে মহকুমায় বিভক্ত করা হলে এর পরেই বছরই ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে, জেলা সদর দফতর চন্দ্রঘোনা থেকে রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তর করা হয়। 

১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে, ইংরেজরা লুসাই পাহাড় দখল করে নিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পায়। এই সময় রাঙ্গামাটিকে মহকুমায় পরিণত করা হয়। 

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা থেকে বান্দরবান কে আলাদা জেলা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে, খাগড়াছড়ি কে ও একটি পৃথক জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। পরবর্তীতে পার্বত্য জেলার মূল অংশ টি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় আত্মপ্রকাশ করে।

রাঙ্গামাটি জেলা ১০টি উপজেলা, ১২টি থানা, ২টি পৌরসভা, ৫০টি ইউনিয়ন, ১৫৯টি মৌজা, ১৩৪৭টি গ্রাম ও ১টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত।[

১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধে জয় লাভের পর জিয়াউর রহমান সরকার এই অঞ্চলে চার লক্ষ ভূমিহীন বাঙালীকে পুনর্বাসিত করেন।বর্তমানে তারাও এই অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য জনজাতিতে পরিণত হয়েছে।। বাঙালি ছাড়াও এ অঞ্চলে ১৪টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বসবাস করেন। তারা হলো যথাক্রমে  চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, চাক্, পাংখোয়া, লুসাই, সুজেসাওতাল ও রাখাইন।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি জেলার বর্তমান জনসংখ্যা ৬,২০,২১৪ জন। এ জেলায় বাঙালিদের অধিকাংশই মুসলমান। এছাড়া বাঙালি কিছু হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আছে। ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং কিছু সংখ্যক হিন্দু এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী আছে।

‘রাঙামাটি’ জেলা নামকরণের ইতিহাস

রাঙামাটি জেলা’র নামকরণ প্রসঙ্গে কোথাও বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা না থাকলেও বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশ জেলা : নামকরণের ইতিহাস’ বই তে এর কিছু বিবরণ পাওয়া যায়- এই এলাকায় পর্বতরাজি গঠিত হয়েছিল টারশিয়রি যুগে। এই যুগের মাটির প্রধান ব্যতিক্রম এবং বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর রঙ লালচে বা রাঙা। এই এলাকার গিরিমৃত্তিকা লাল এবং মাটিও রাঙা বলেই এই জনপদের নাম হয়েছে রাঙামাটি।

ভিন্নমতে, বর্তমান রাঙামাটি জেলা সদরের পূর্বদিকে একটি ছড়া ছিল, যা এখন হ্রদের মধ্যে নিমজ্জিত। এই হ্রদের স্বচ্ছ পানি যখন লাল বা রাঙামাটির উপর দিয়ে ঢাল বেয়ে প্রপাত ঘটাতো, তখন তাকে লাল দেখাতো। তাই এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল ‘রাঙামাটি’।

এই জেলা সদরের পশ্চিমে আরও একটি ছড়া ছিল। অনুরূপ কারণে তার নাম দেয়া হয়েছিল ‘রাঙাপানি’। এই দুই রাঙা ছড়ার মোহনার বাঁকেই গড়ে উঠেছে বর্তমান জেলা শহর। এই দুটি ছড়া রাঙামাটি ও রাঙাপানি হতে ‘রাঙামাটি’ জেলার নামকরণ হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। ১৯৮৩ সালে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা গঠন করা হয়।

‘৭১ এ রাঙামাটি জেলা

ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে রাঙ্গামাটি জেলায় ঘটিত অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহ দেখতে পাই। ১৯৭১ সালে, ১ নং সেক্টরের অধীনে ছিল রাঙামাটি জেলা।

২৭ মার্চ স্টেশন ক্লাবের মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। ২৯ মার্চ ৬০ জনের ১টি দল যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য ভারতে যায়। ১২ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ১০ এপ্রিল প্রথম দল ফিরে আসে এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। এই দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন বীর উত্তম আফতাব কাদের। তাদের মধ্যে একটি দল ১৫ এপ্রিল রাঙামাটি শহরের কোর্টবিল্ডিং দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। কিন্তু শহরে আগে থেকে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং নির্মম ভাবে তাদের হত্যা করা হয়। সেদিনের শহীদদের মধ্যে রয়েছেন আবদুস শুক্কুর, এস. এম. কামাল, ইফতেখার, ইলিয়াস, মামুন প্রমুখ। এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করছিলেন মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) আবদুল আলী। তাঁকেও পাকিস্তানিরা নৃশংসভাবে হত্যা করে।

২০ এপ্রিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলটির একটি কোম্পানি (১৫০-২০০ জন) খাগড়াছড়ি দখলের জন্য নদীপথে এগিয়ে গেলে নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ একাই তাদের ২টি লঞ্চ ও ১টি স্পিডবোট ডুবিয়ে দেন। যার ফলশ্রুতিতে এক প্লাটুন (৪০-৪৫ জন) শত্রু সৈন্য নিহত হয়।বরকল, ফারুয়া ও শুকুরছড়িতে পাকবাহিনীর সামরিক ঘাঁটি ছিল। ফারুয়া এলাকায় বেশ কয়েকটি খন্ড যুদ্ধে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৪ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি জেলা শত্রুমুক্ত হয়।

রাঙামাটি জেলা’র নদনদী 

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার প্রধান নদী হচ্ছে কর্ণফুলি নদী। এ নদী ভারতের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার উত্তর পূর্ব সীমান্তদিয়ে বরকল উপজেলার থেগামুখ নামক স্থানে ভারতের লুসাই নদী ও বাংলাদেশ অংশের থেগা খাল মিলিত হয়ে কর্ণফুলী নদী নাম ধারণ করে।

এছাড়াও এই জেলায় ‘রেংখিয়ং’ নামে একটি প্রাকৃতিক হ্রদ এবং ‘ কাপ্তাই’ নামে একটি কৃত্রিম হ্রদ রয়েছে।

দর্শনীয় স্থান

নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। এই জেলাটি পর্যটক দের নিকট ভ্রমণের জন্যে অত্যন্ত   আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক রাঙ্গামাটি জেলায় আসে শুধু ভ্রমনের উদ্দেশ্যে। এই জেলার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কংলাক পাহাড়, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, হাজাছড়া ঝর্ণা, সাজেক ভ্যালি, ঝুলন্ত সেতু, কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝর্ণা, দুমলং, পেদা টিং টিং, প্যানোরমা জুম রেস্তোরা, মুপ্পোছড়া ঝর্ণা, লাভ পয়েন্ট, চাকমা রাজবাড়ি, রাজবন বিহার, বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্সনায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি ভাস্কর্য, ধুপপানি ঝর্ণা, আসামবস্তি ব্রীজ, ওয়াজ্ঞা চা এস্টেট ইত্যাদি। এই সব স্থান এর বাইরেও পার্বত্য অঞ্চল হওয়ার কারণে পাহাড়ে ভ্রমণ করার লোভেও অনেক ভ্রমনপিপাসু রাঙামাটি ছুটে আসে।

                              চিত্রঃ কাপ্তাই লেক

                         চিত্রঃ সাজেক ভ্যালি 

                                 চিত্রঃ শুভলং ঝর্ণা 

                                                চিত্রঃ ঝুলন্ত সেতু

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ 

অন্যান্য জেলার মতো রাঙামাটি জেলাটি ও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্মস্থান হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছে। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন, ‘প্রাক্তন সংসদ সদস্য  ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী বিনয় কুমার চাকমা’, ‘কণ্ঠশিলী কনক চাপা’, ‘প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী কল্প রঞ্জন চাকমা’, ‘রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মী দেবশিস রায়’, ‘ কথা সাহিত্যিক বিনীতা রয়’,  এবং ‘জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সমাজকর্মী সুবিমল দেওয়ান’ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

তথ্যসূত্রঃ 

১.http://bn.banglapedia.org/index.php?title=রাঙ্গামাটি_জেলা

২.http://onushilon.org/geography/bangladesh/region/rangamati.htm

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button