ইতিহাস

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ‘নোয়াখালী’

নোয়াখালী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি জেলা।‎ এই জেলা টি  বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ২২°০৭’ থেকে ২৩°০৮’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°৫৩’ থেকে ৯১°২৭’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।  নোয়াখালী জেলার মোট  আয়তন ৪২০২ বর্গ কিলোমিটার। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।

নোয়াখালী জেলা পূর্বে মূলত ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালী সদর মহকুমা নিয়ে একটি বৃহত্তর অঞ্চল ছিলো।পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলা কে আলাদা জেলায় রুপান্তর করা হয়। শুধু নোয়াখালী মহকুমা নিয়ে নোয়াখালী জেলা পুনর্গঠিত হয়। অর্থাৎ বৃহত্তর নোয়াখালী ৩ টি আলাদা জেলায় ভাগ হয়ে যায়।তখন এ জেলায় উপজেলা ছিল ছয়টি। পরবর্তীতে আরো তিনটি উপজেলার সৃষ্টি করা হয়। এবং বর্তমানে জেলায় মোট উপজেলার সংখ্যা নয়টি। হাতিয়া নামক উপজেলাটির কিছু অংশ জেলার মূল ভূখন্ডের সাথে সংযুক্ত থাকলেও এর বৃহত্তর অংশ (মূল হাতিয়া) এর চর্তুদিকে মেঘনা নদী দ্বারা বেষ্টিত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা।নোয়াখালী জেলার উত্তরে কুমিল্লা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলা এবং পশ্চিমে লক্ষ্মীপুর ও ভোলা জেলা অবস্থিত।

কথিত আছে, প্রায় ৩০০০ বছর পূর্বে এই জেলায় জনবসতি গড়ে উঠেছিলো। ২০১১ এর আদমশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার বর্তমান জনসংখ্যা ৩৩,৭০,২৫১ জন।

                       চিত্রঃ বাংলাদেশ এর মানচিত্রে নোয়াখালী জেলা’র অবস্থান 

জেলা প্রশাসনের পটভূমি

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, “নোয়াখালী” জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায় মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক এদেশে জেলা প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় থেকেই।

১৭৭২ সালে, কোম্পানীর গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস  সমগ্র বাংলাদেশকে ১৯টি জেলায় বিভক্ত করে প্রতি জেলায় একজন করে কালেক্টর নিয়োগ করেন। এ ১৯টি জেলার একটি ছিল “কলিন্দা”। এই কলিন্দা জেলা টি গঠিত হয়েছিলো মূলত নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে। কিন্তু এর পরের বছরেই, অর্থাৎ ১৭৭৩ সালে, কর্তৃপক্ষ জেলা প্রথার পরিবর্তে প্রদেশ প্রথার প্রবর্তন করেন এবং  জেলাগুলোকে করা হয় প্রদেশের অধীনস্থ অফিস। 

কিন্তু প্রদেশ প্রথা চিরস্থায়ী হয়নি। ১৭৮৭ সালে, পুনরায় জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং সমগ্র বাংলাদেশ কে ১৪ টি জেলায় ভাগ করা হয়। এই ১৪ টি জেলার মধ্যেও “ভুলুয়া” নামে নোয়াখালী অঞ্চলে একটি জেলা ছিলো। পরবর্তীতে ১৭৯২ সালে, নতুন একটি জেলা সৃষ্টি করে “ভুলুয়া” কে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।এই নতুন জেলার নামকরণ করা হয় “ত্রিপুরা”। ১৮২১ সালে এই অঞ্চল কে একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও তা ভুলুয়া নামেই পরিচিত ছিলো। ১৮৬৮ সালে, “ভুলুয়া” জেলার নাম পরিবর্তন করে “নোয়াখালী” রাখা হয়।

জেলা নামকরণ

নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ছিলো “ভুলুয়া”। পুরান ভাষ্যমতে, একবার ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয়। এর ফলে ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসাবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়, যা পানির প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ি ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে। এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় নোয়া (নতুন) খাল বলা হত, এর ফলে অঞ্চলটি একসময়ে লোকের মুখেমুখে পরিবর্তিত হয়ে নোয়াখালী হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে।[১]

নোয়াখালী জেলার প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

নোয়াখালী জেলায় ৯টি উপজেলা, ৮ টি পৌরসভা, ৭২ টি ওয়ার্ড, ১৫৩ টি মহল্লা, ৯১ টি ইউনিয়ন, ৮৮২ টি মৌজা এবং ৯৬৭ টি গ্রাম রয়েছে।

নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম ছিলো “সুধারাম”। ১৯৪৮ সালে নদী ভাঙ্গনের ফলে শহর টি কে ৮ কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে বর্তমান মাইজদী তে স্থানান্তর করা হয়। ফলে মাইজদী ই নোয়াখালী জেলা সদরের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

নোয়াখালীর উল্লেখযোগ্য নদ-নদীর মাঝে ছোট ফেনী, ডাকাতিয়া অন্যতম।

ঐতিহাসিক আন্দোলনে নোয়াখালী জেলা’র ভূমিকা 

“নোয়াখালী” জেলার ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা ১৮৩০ সালে নোয়াখালীর জনগণের জিহাদ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ১৯২০ সালের খিলাফত আন্দোলন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় ও নোয়াখালী জেলার অনেক টা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো। এই দাঙ্গার পর মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী জেলা ভ্রমণ করেন। বর্তমানে সোনাইমুড়ি উপজেলার জয়াগ নামক স্থানে গান্ধীজির নামে একটি আশ্রম রয়েছে, যা “গান্ধী আশ্রম” নামে পরিচিত। এটি একটি ঐতিহাসিক এবং জনকল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

এছাড়াও ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে নোয়াখালী জেলায় ঘটিত অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহ দেখতে পাই।  পাক হানাদার বাহিনীর সাথে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নোয়াখালীর মাটি রঞ্জিত হয়ে আছে। ১৫ই জুন, ১৯৭১ সালে সোনাপুর আহমদীয়া স্কুলের সম্মুখ যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। ১৯৭১ সালের ১৯ আগস্ট পাকবাহিনী বেগমগঞ্জ থানার গোপালপুরে গণহত্যা চালায়; নিহত হন প্রায় ৫০ জন নিরস্ত্র মানুষ [২]। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এই রকম আরো অসংখ্য ঘটনা জড়িয়ে আছে নোয়াখালী জেলার সাথে। নোয়াখালী জেলা স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্যে এই অঞ্চলের ৪০ জন যোদ্ধা পেয়েছে বিশেষ রাষ্ট্রীয় খেতাব।

দর্শনীয় স্থানসমূহ

নোয়াখালী জেলায় অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান আছে যা দেখতে প্রতিবছর হাজারো ভ্রমনপিপাসু দূর দুরান্ত থেকে এসে ভীড় করে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য স্থান হলো, নিঝুম দ্বীপ, মুছাপুর সি বীচ,বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, গান্ধী আশ্রম, কমলা রানীর দিঘি ইত্যাদি। 

                                চিত্রঃ নিঝুম দ্বীপ

                                      চিত্রঃ মুছাপুর সি বীচ

                                                             চিত্রঃ গান্ধী আশ্রম

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ

নোয়াখালী জেলা অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্মস্থান হিসেবে সকলের নিকট অত্যাধিক পরিচিত। যাদের অনেকেই সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন, শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন, শহীদ বুদ্ধিজীবী এ.এন.এম. মুনীর চৌধুরী, শহীদ সার্জেন্ট জ‎হুরুল হক, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হবিবুর রহমান, বাংলা একাডেমি বই মেলার উদ্যোক্তা চিত্তরঞ্জন সাহা, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা হেমপ্রভা মজুমদার, মধ্যযুগের অন্যতম শেষ্ঠ কবি মো. আবদুল হাকিম, গীতিকার-সুরকার-গায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, ঔপন্যাসিক প্রণব ভট্ট, দেশের প্রথম নারী এবং বর্তমান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী,  শিক্ষাবিদ ও লেখক মোতাহার হোসেন চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। 

তথ্যসূত্র 

১.http://www.noakhali.gov.bd/site/page/45c4da24-2144-11e7-8f57-286ed488c766/%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%80%20%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0%20%E0%A6%AA%E0%A6%9F%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%AE%E0%A6%

২. https://noakhalizillasamitydhaka.com/nzilla/3

৩.https://www.google.com/search?q=nijhum+dwip&tbm=isch&ved=2ahUKEwjjnv_LkcvtAhWCBbcAHZHjC2kQ2-cCegQIABAA&oq=NIJHUM+&gs_lcp=CgNpbWcQARgAMgIIADIECAAQQzICCAAyAggAMgIIADICCAAyAggAMgIIADICCAAyAggAOgUIABCxA1Cs0AlYv-gJYJX4CWgBcAB4AIABpAKIAfcNkgEFMC4yLjaYAQCgAQGqAQtnd3Mtd2l6LWltZ8ABAQ&sclient=img&ei=ByHWX6P_KoKL3LUPkcevyAY&bih=657&biw=1366#imgrc=MtQE2Mzxqo5RcM

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button