ইতিহাস

নাফ নদীর যুদ্ধের ইতিহাস | বাংলাদেশের কাছে মিয়ানমারের হার !

সাম্প্রতিক সময়ের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ বৈরি । এই বৈরিতার নানা কারণের মধ্যে ২০০০ সালে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে নাফ নদীর তীরে সংঘটিত এক খন্ডযুদ্ধ উল্লেখ করার মতোই এক ঘটনা। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট জানতে আমাদের আরেকটু পিছিয়ে যেতে হবে। ১৯৬৬ সালে সীমান্ত নিষ্পত্তিকরণের সময় তৎকালীন পাকিস্তান ও বার্মা সরকার একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। এই চুক্তির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমসাময়িক সময়ের নাফ নদী-খাতের মধ্যস্থিত অংশকে দুই দেশের সীমানা রূপে চিহ্নিত করা হয়। দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলে নাফ নদীর বারোটি শাখা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের কেউ ই, নাফ নদীর মূল অংশ কিংবা এর শাখাগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

কিন্তু মায়ানমার এই চুক্তি অগ্রাহ্য করে ২০০০ সাল নাগাদ এই বারোটির মধ্যে এগারোটিতেই বাঁধ নির্মাণ করে। এতে করে নাফ নদীর মূল প্রবাহ বাংলাদেশের দিকে সরে আসে, এবং প্রায় ২৫০০ একর ভূখণ্ড বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ নানা সময়ে সতর্কবার্তা পাঠালেও মায়ানমার তাদের অপচেষ্টা বন্ধ করেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৯ সালের শেষ নাগাদ সব কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাঁধ দেয়ার প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত আসে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। ২০০০ সালে মায়ানমার নাফ নদীর সর্বশেষ শাখাতেও বাঁধ দিতে উদ্যোগী হলে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে বাদানুবাদ হয়। কয়েক দফা দুই দেশের মধ্যে উত্তপ্ত ভাষায় চিঠি চালাচালিও হয়। এই বাঁধ হয়ে গেলে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হতো, যা টেকনাফ শহরের অস্তিত্বের জন্য ছিলো হুমকিস্বরূপ।

মায়ানমারে এই রিরূপ আচরণের ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পরে। অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশের সামরিক অবস্থান ছিল মায়ানমারের ভূমি থেকে কিছুটা নিচে। তবে সম্ভাব্য যুদ্ধের জয় পরাজয় নির্ধারণকারী বিষয় হয়ে দাঁড়ায় গোলাবারুদের পর্যাপ্ততা। পর্যাপ্ত গোলাবারুদের সরবরাহ নিশ্চিত থাকলে বাংলাদেশের জয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে পড়বে এই বিশ্বাস ছিলো বিডিআর এর। এই লক্ষ্যে বিডিআর এক রাতের মধ্যে মর্টারের গোলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের পঁচিশ লাখ গোলাবারুদ কক্সবাজারে মজুদ করে রাখা শুরু করে। এর মধ্যে অর্ধেক কক্সবাজারে মোতায়েন রাখা হয়, আর বাকি গোলাবারুদ বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

যুদ্ধ শুরু হয় টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নে তোতার দ্বীপ সংলগ্ন অঞ্চলে। এখানে নাফ নদীর একটি বাঁকের সামনে প্রথম গুলি শুরু করে বিডিআর। অর্থাৎ এটি ছিল একটি আক্রমণাত্মক এঙ্গেজমেন্ট। দেশী-বিদেশী প্রচার মাধ্যম গুরুত্বের সাথে এই যুদ্ধের খবরাখবর প্রদান করে। মিয়ানমারও পালটা আক্রমণ চালায়। মিয়ানমার এর তরফ থেকে মিয়ানমার নাসাকা, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী এই যুদ্ধে অংশ নেয়।

সংঘর্ষের জায়গাটা টেকনাফ শহরের থেকে বেশ খানিকটা উজানে। এখানে বনভূমি কিছুটা পাতলা ও বার্মার অংশে এখানে শুরু হয়েছে পাহাড়। এসব পাহাড় মায়ানমারের জন্য সুবিধাজনক হলেও শেষমেশ তাদের শোচনীয় পরাজয় রুখতে পারেনি। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই জয়-পরাজয় স্পষ্ট হয়ে যেতে থাকে। প্রায় ছয় শতাধিক সৈন্য, ও বাঁধ নির্মাণের শ্রমিক বিডিআরের এই হামলায় মারা যায়। 

যুদ্ধে বার্মার সেনা সমাবেশ ও হতাহতের খবর গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত। যুদ্ধের কিছু আগেই বেশ কিছু গোয়েন্দাকে বার্মায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো তথ্য সংগ্রহের জন্য। তাদের থেকে পাওয়া সূত্রমতে জানা যায় বাংলাদেশের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের পর মায়ানমার তাদের একজন মেজর জেনারেল ও একজন রিয়ার এডমিরালের অধীনে মায়ানমারের নিয়মিত বাহিনীর ২৫০০০ সৈন্য মোতায়েন করে যুদ্ধক্ষেত্রে। 

নাফ যুদ্ধে সবচেয়ে বিরল যে কৃতিত্ব বিডিআর অর্জন করে, তা হচ্ছে শূন্য মৃত্যুহার। তিনদিন ব্যাপী ঘোরতর যুদ্ধে মায়ানমারের ছয় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হলেও বিডিআরের একজনেরও প্রাণহানি ঘটেনি। তবে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতের ঘটনা ঘটেছিলো। যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রেঙ্গুনের কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়ে। ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা, স্টেট পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল নামের একটি পরিষদের মাধ্যমে মায়ানমার শাসন করতো। এই পরিষদের চেয়ারম্যান, সিনিয়র জেনারেল থান শোয়ে ছিলেন মায়ানমারের শীর্ষ নেতা। তিনি একাধারে ছিলেন মায়ানমারের সরকার প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও মায়ানমারের একমাত্র জাতীয় দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ নেতা।

যুদ্ধে মায়ানমারের শোচনীয় অবস্থা দেখে জেনারেল থান শোয়ে রেঙ্গুনে নিযুক্ত বিদেশী সাংবাদিক ও রাষ্ট্রদূতদের তলব করে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবার কোন পরিকল্পনা মায়ানমারের নেই। যে ‘ভুল বোঝাবুঝির’ কারণে সীমান্তে সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে, তা নিরসনে তিনি বাংলাদেশের সাথে নিঃস্বার্থ আলোচনার প্রস্তাব দেন।

যুদ্ধ থেকে একতরফা প্রত্যাহারের কারণে যুদ্ধ স্তিমিত হয়ে পড়ে। বার্মার নিঃশর্ত আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলাদেশের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল মংডু গমন করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলে শামিল ছিলেন সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে হাতে লেখা অঙ্গিকারনামা স্বাক্ষরিত হয়। অঙ্গীকারনামায় ভবিষ্যতে কখনো নাফ নদীতে কোন রূপ বাঁধ নির্মাণের প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকার ওয়াদা করে মায়ানমার। এছাড়াও যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে আলোচনা ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে মায়ানমার।

যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও মেয়াদের দিক থেকে নাফ যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী হলেও এই যুদ্ধ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তার করে। এই যুদ্ধের পর থেকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যায়ে নিয়মিত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়। এই যুদ্ধ প্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী বাংলাদেশ রাইফেলসের গরিমাকে বহুগুনে উন্নীত করে। যুদ্ধে বিজয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক সৈনিককে ‘অপারেশন নাফ পদক’ নামে একটি বীরত্বসূচক পদক প্রদান করে।

লেখক- Syed Siddique Mridul ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button