ইতিহাস

গালিপলি যুদ্ধের ইতিহাস – ১৯১৫-১৬

গ্যালিপলি ক্যাম্পেইন ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে গ্যালিপলি উপদ্বীপে একটি যৌথ আক্রমণ যেটি গ্যালিপলির যুদ্ধ নামে পরিচিত। তুর্কি ভাষায় এ যুদ্ধ চানাক্কালে যুদ্ধ নামেও পরিচিত। ক্যাম্পেইনটি ১৯১৫ থেকে শুরু করে ১৯১৬ পর্যন্ত চলমান ছিল। এই খন্ডযুদ্ধে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ব্রিটেনের তৎকালীন কলোনী অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড এবং ইন্ডিয়া যৌথভাবে অট্টোমান সাম্রাজ্য ও জার্মানির বিরুদ্ধে লড়েছিলো।

রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কমান্ডার গ্র্যান্ড ডিউক নিকোলাসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৫ সালের ২রা জানুয়ারি, ব্রিটিশ সরকার ককেশাস ফ্রন্টে রাশিয়ানদের উপর অটোমানদের চাপ কমাতে তুরস্কের বিরুদ্ধে একটি অভিযান পরিচালনা করতে সম্মত হয়েছিলো। জায়গা হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছিলো দার্দেনালিসকে। এই অভিযানটি তৎকালীন ‘First Lord of Admirality’ উইনস্টন চার্চিল কর্তৃক দৃঢ়ভাবে সমর্থিত একটি সম্মিলিত অভিযান হিসেবে পরিচালিত হয়। জানুয়ারীর ২৮ তারিখে সিদ্ধান্ত হয় যে এই সামরিক অভিযানটি শুধু নৌবাহিনী দ্বারা পরিচালনা করা হবে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই, ১৬ই ফেব্রুয়ারি এই সিদ্ধান্ত কিছুটা পরিবর্তীত হয়।

সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বলা যায়, ভূমধ্যসাগরে মিত্রশক্তির নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজ বেশ পুরোনো ছিলো। এই জাহাজগুলো সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহৃত জাহাজ ছিলো না। এগুলো প্রধাণত পরিবহণের কাজেই ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। তাই এইসব পুরোনো জাহাজের সাহায্যে এতবড় একটি অভিযান পরিচালনা করা রীতিমত অকল্পনীয়। এছাড়াও আরেকটি পুরোনো জাহাজ ব্যবহারের কারণ হিসেবে দেখানো হয় যে, যেহেতু অটোমান নৌশক্তি খুব দুর্বল ছিলো সেসময় তাই ব্রিটিশরা তাদের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ এই যুদ্ধে না এনে জার্মানদের ঠেকাতে অন্যত্র মোতায়েন রেখেছিলো। পুরোনো জাহাজগুলোর শক্তিমত্তা বৃদ্ধি করতে এবার পূর্ব পরিকল্পনার সাথে  সেনাবাহিনীর একটি বড় দল যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই উদ্দেশ্যে জেনারেল স্যার ইয়ান হ্যামিল্টনের অধীনে একটি বৃহৎ সামরিক বাহিনী মিশরে একত্রিত হয়। ফরাসী কর্তৃপক্ষও একটি ছোট্ট সেনাদলকে এই অভিযানে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে।

সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ৩ দিনের মধ্যেই অভিযান শুরু করার নির্দেশ এলো। ১৯ ফেব্রুয়ারী থেকে নৌবাহিনীর প্রবল গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছিল দার্দেনালিসকে ঘিরে। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে এই গোলাবর্ষণ থামানো হয়েছিল এবং ২৫শে ফেব্রুয়ারি অবধি তা বন্ধই রাখা হয়। ১৮ ই মার্চ থেকে পুনরায় গোলাবর্ষণ শুরু করা হয়। তবে অটোমানদের পালটা আক্রমণে, তিনটি জাহাজ ডুবে গেলে এবং আরও তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্থ হলে নৌবাহিনী তাদের আক্রমণ বন্ধ করে। অটোমানরা দার্দেনালিস প্রণালীর তীর ঘেষে অনেকগুলো কামান প্রস্তুত রাখে। তীরের কাছ দিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ জাহাজগুলো এই কামানেএ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অটোমানদের দৃঢ়তায় টিকতে না পেরে ব্রিটিশরা এবার এই সিদ্ধান্ত নেয় যে সামরিক সহায়তা ছাড়া শুধুমাত্র নৌবহর দিয়ে কোনোক্রমেই সফল হতে পারবে না তারা।

নৌ যুদ্ধের পর মিত্রশক্তির সৈন্যরা ২৫শে এপ্রিল গ্যালিপলি উপদ্বীপের দুইটা ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নামে। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এর সৈন্যরা উপদ্বীপের একটি বীচে নামে। এই বীচ পরবরেতীতে ANZAC Cove নামে পরিচিতি পায়। অন্য গ্রুপটি Helles Cove নামক যায়গায় নামে। এই গ্যালিপলি উপদ্বীপেই অনেকগুলো খন্ড যুদ্ধ হয় অটোমানদের সাথে মিত্রাশক্তির। এক পর্যায়ে যুদ্ধ অনেকটা স্থবির হয়ে পরে।

যুদ্ধের এই অবস্থায় ১৯১৫ সালের মে মাসে First Sea Lord Adm. Lord Fisher পদত্যাগ করেন। তিনি এত কম জনবল নিয়ে এত বৃহৎ আকারের একটি যুদ্ধ পরিচালনার বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ তার কথাকে আমলে নেয় নি। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে আরও শক্তিবৃদ্ধি না করলে যুদ্ধে অগ্রগতির কোনো সুযোগ নেই। এবার কর্তৃপক্ষ হ্যামিল্টনের বদলে লেফটেনেন্ট জেনারেল স্যার চার্লস মনরোকে  আনলেন যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য। স্যার চার্লস মনরো ক্ষমতা নেয়ার পর নিজেও যুদ্ধের এই অবস্থা দেখে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব করলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে। সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল শুরু থেকে, নভেম্বরে যুদ্ধের প্রধান সেক্রেটারি, লর্ড কিচেনার নিজে যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনকালে তা সমর্থন করলেন।

সামগ্রিকভাবে, এ যুদ্ধে প্রায় ১৬ টি ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যান্ড, ভারতীয় এবং ফরাসী বিভাগ অংশ নিয়েছিল। এ যুদ্ধে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ বাহিনীর হতাহত সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ১৩ হাজার। এই অভিযানটির কেবলমাত্র একটি সাফল্য ছিল কারণ এটি রাশিয়ানদের থেকে বিশাল তুর্কি বাহিনীর মনোযোগ সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে আসতে সক্ষম হয় ফলে রাশিয়ান বাহিনী তাদের পূর্নশক্তি নিয়ে প্রধান ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে পারে। এছাড়া এ যুদ্ধে সম্মিলিত ব্রিটিশ বাহিনীর বিশেষ কিছু অর্জন নেই। কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল সামরিক নেতৃত্ব, গেরিলা পদ্ধতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যবহার, সেনাবাহিনীর অনভিজ্ঞতা, অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম, শেল এর অভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ কৌশলসহ নানা কারণ এই পরিকল্পনাটি আকাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই অভিযানের গুরুতর রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াও ছিল। সারা বিশ্বজুড়ে এই যুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসিদের আপাত ব্যর্থতা এই ধারণা সঞ্চার করে যে মিত্রশক্তির দেশগুলো সামরিকভাবে অদক্ষ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button