জীবনী

ওরহান গাজীর জীবনী | অটোম্যান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক

ওরহান গাজী, প্রকৃত নাম ওরহান বিন ওসমান অটোমান রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক। ওরহান গাজী তার শাসনামলের পুরোটা জুড়েই বলকানে তার রাজত্ব বিস্তার করেছেন। তার রাজত্বের প্রথম দিকে তিনি তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আনাতোলিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল জয়েই নিজের শক্তি ও মনোযোগ ব্যয় করেছেন। এই অঞ্চলগুলির বেশিরভাগই বাইজেন্টাইন শাসনের অধীনে ছিল। ওরহান বাইজেন্টাইন সম্রাট অ্যান্ড্রোনিকোস তৃতীয় পালাইওলোগজের বিরুদ্ধে পেলেকাননে প্রথম লড়াইয়ে জয়ী হন। ওরহান বালাকেসিরের করাসিদ এবং আঙ্কারার আহিসদের অঞ্চলও জয় করেছিলেন। ইবনে বতুতার মতে ওরহান গাজী ছিলেন “তুর্কী রাজাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সম্পদের দিক থেকেও সবচেয়ে ধনী শাসক।“

ওরহান গাজী ১২৮১ সালের দিকে তুরস্কের সোগুতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওসমান গাজীর প্রথম সন্তান। ওরহানের পিতা ওসমান ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক। ওরহানের দাদা অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এর্তুগুল গাজী, ওরহান আপ্লের নামের সাথে মিলিয়ে তার নাতির নাম রেখেছিলেন। ওরহান গাজীর শৈশব নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি কিন্তু ওরহান শৈশব থেকেই তার পিতার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানা যায়। কিছু ইতিহাসবিদ দাবি করেন যে, অরহানের যখন ২০ বছর বয়স তখন তার পিতা তাকে অটোমান সাম্রাজ্যের একটি ছোট শহর নাকিহিরেতে প্রেরণ করেছিলেন, তবে ওরহান ১৩০৯ সালে অটোমান রাজধানী সোগুতে ফিরে আসেন।

ওসমান গাজী ১৩২৪ থেকে ১৩৩৩ মধ্যে কোনো এক বছরে মৃত্যবরণ করেন এবং ওরহান তার স্থলাভিষিক্ত হন। অটোমান রীতি অনুসারে ওরহান তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর তার ভাইকে অটোমান সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্থাব দেন। কিন্তু তার ভাই আলাউদ্দিন এই উদীয়মান সাম্রাজ্যের অংশীদার হতে অমত প্রকাশ করেন এবং ওরহানের প্রস্থাব ফিরিয়ে দেন। আলাউদ্দিন তার ভাইকে অটোমান সাম্রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধীকার হিসেবে মনোনীত করেন এবং এই বিশাল সাম্রাজ্যকে ভাগ হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন।

ওরহানের নেতৃত্বে, উত্তর-পশ্চিম আনাতোলিয়ায় ছোট অটোমান সাম্রাজ্যের যোদ্ধারা বাইজেন্টিয়ামের বিরুদ্ধে ঐক্য জোট হতে থাকে। ১৩২৪ সালে ওরহানের নেতৃত্বে অটোমান সৈনিকরা বুরসার বাইজেন্টাইন শহরের পতন ঘটায়। এই সুত্র ধরে পরবর্তিতে  অটোমানদের হাতে ১৩৩১ সালে  নিকিয়া এবং ১৩৩৭ সালে নিকোমেডিয়ার পতন ঘটে।

তারপর ওরহান গাজী তার প্রতিবেশি তুর্কি রাজ্যগুলোর দিকে ফিরে তাকান এবং করাসের রাজবংশের মতো অন্যান্য দুর্বল রাজবংশের উপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। তিনি আনাতোলিয়ার উত্তর-পশ্চিম কোণে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বলকান অতিক্রম করে পঞ্চম জন প্যালেওয়ালাসের বিরুদ্ধে বাইজেন্টিয়ানদের যুদ্ধে সহোযোগিতা করায় ওরহান গাজী ভবিষ্যতের বাইজেন্টাইন সম্রাট ষষ্ঠ জন ক্যান্টাকুজেনাসের মূল সহযোগী হয়ে উঠেন।

১৩৪১ থেকে ১৩৪৭ সালের মধ্যে সংঘটিত বাইজেন্টাইন গৃহযুদ্ধের সময়ে  ষষ্ঠ জন  ক্যান্টাকুজেনাস তার মেয়ে থিওডোরাকে ওরহান গাজীর সাথে বিয়ে দেয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট ডাউজারের বিরুদ্ধে অটোমান যোদ্ধাদের নিয়োগ দিয়ে তাদের থ্রেস লুট করার অনুমতি দেয়। ১৩৫২-১৩৫৭ সাল পর্যন্ত হওয়া বাইজেন্টাইন গৃহযুদ্ধে  ক্যান্টাকুজেনাস অরহানের বাহিনীকে পঞ্চম জনের বিপক্ষে ব্যবহার করেছিল।

ওরহান অটোমান সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। তিনি ১৩২৭ সালে নিজের নামে প্রথম অটোমান রৌপ্য মুদ্রা ছাপিয়েছিল। তিনি জয় করা শহরগুলোতে বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল তৈরি করেছিলেন যা পরবর্তীকালে অটোমান সাম্রাজ্যকে একটি বড় ইসলামিক কেন্দ্র হিসাবে পরিণত করেছিল ।

১৩৫৬ সালে ওরহান ও থিওডোরার ছেলে খলিলকে ইজমিরের আশেপাশের কোনো অঞ্চল থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। একজন জেনোস বাণিজ্যিক জাহাজের কেপ্টেন যুবরাজ খলিলকে অপহরণ করে জেনোসির অধীনে থাকা এজিয়ান সাগরের ফোকিয়ায় নিয়ে যায়। অপহরণের পর ওরহান গাজী বাইজেন্টাইন সম্রাট পঞ্চম জন প্যালেওয়ালাসের সাথে আলোচনা করেন এবং তাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে পঞ্চম জন তার বাইজেন্টাইন নৌবহর নিয়ে ফোকিয়ায় যাত্রা করেন এবং ১০ হাজার হাইপারপিরা মুক্তিপণ দিয়ে খলিলকে আবার অটোমান সাম্রাজ্যে নিয়ে আসে।

১৩৪৭ সালে অরহানের সবচেয়ে বড় ও অভিজ্ঞ পুত্র এবং সম্ভবত সিংহাসনের উত্তরাধিকারী সুলেমান পাশা মরমর সমুদ্রের উপকূলে  বোলেয়ারের কাছে একটি ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার পরে আহত হয়ে মারা যান। সুলেমান যে ঘোড়াটি থেকে পরে মারা গিয়েছিল যে ঘোড়াটিকেও সুলেমানের পাশে কবর দেওয়া হয় এবং তাদের সমাধিগুলি আজও দেখা যায়। পুত্র সুলেমানের মৃত্যু ওরহান গাজীকে তীব্রভাবে স্পর্শ করেছিল।

তার জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি তার রাষ্ট্রের বেশিরভাগ দায়িত্ব তার দ্বিতীয় পুত্র মুরাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং বুরসায় নির্জন জীবনযাপন করেছিলেন।

পুত্র সুলেমানের মৃত্যু ওরহান গাজীর স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলেছিল। ১৩৬২ সালে ওরহান গাজী ছত্রিশ বছরের রাজত্বের পর আশি বছর বয়সে বুরসায় মৃত্যুবরণ করেন। তাকে তার গত হওয়া স্ত্রী ও সন্তানদের পাশে বুরসায় সমাধিস্থ করা হয়। ওরহান গাজী অন্যান্য অটোমান সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় রাজত্ব করেছিলেন।

লেখক – আনিকা আফিয়া জাহান নদী ( নিয়মত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button