জীবনী

সুলতান মুরাদের জীবনী | অটোমান সাম্রাজ্যের তৃতীয় শাসক

সুলতান মুরাদ অটোমান সাম্রাজ্যের তৃতীয় শাসক যিনি ১৩৬০ থেকে ১৩৮৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। সুলতান মুরাদের শাসনামলে আনাতোলিয়া এবং বলকানে দ্রুত অটোমান সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলোতে অটোমান শাসন নতুন রূপে উত্থান ঘটেছিল এবং প্রশাসনিক ও সরকারী কার্যকলাপও আরো সুসংহত হয়েছিল।

সুলতান মুরাদ ১৩২৬ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের বুরসায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দ্বিতীয় অটোমান সুলতান ওরহান গাজী এবং নীলুফার হাতুনের পুত্র। প্রথম অটোমান সুলতান ওসমান গাজী তার দাদা। প্রথমে মুরাদের কেবল ইজনিকের বেয়ারলবিলিকের শাসনকর্তা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ১৩৫৭ সালে পিতা ওরহান গাজীর প্রথম পুত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকার সুলেমান পাশার আকস্মিক মৃত্যু হলে ভবিষ্যৎ সুলতান হিসেবে মুরাদ নিযুক্ত হন।

সুলতান মুরাদ অ্যাড্রিয়ানোপল জয় করেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে এদির্নে রাখেন। ১৩৬৩ সালে তিনি এদির্নেকে অটোমান সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অটোমান রাজ্যের আরও বিস্তৃতি ঘটায় এবং বলকানদের বেশিরভাগ অঞ্চলই অটোমান শাসনের আওতায় নিয়ে আসেন। সুলতান মুরাদের এই শক্তি এবং ক্ষমতা কেবল দক্ষিণ সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার শাসনকর্তাদেরই নয়, সম্রাট পঞ্চম জন পালাইলোগোসকেও তার সামনে নত হতে বাধ্য করে। মুরাদ প্রশাসনিকভাবে তার সালতানাতকে আনাতোলিয়া ও রুমেলিয়া এই দুটি প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন।

মুরাদ আনাতোলিয়ায় কারামানের শক্তিশালী বেইলিকের বিরুদ্ধে এবং ইউরোপের সার্বিয়ান, আলবানিয়ান, বুলগেরিয়ান এবং হাঙ্গেরিয়ানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সার্বিয়ান ভ্রাতৃদ্বয় রাজা ভুকাসিন ও দেসপট তুরস্ককে অ্যাড্রিয়ানোপল থেকে বহিষ্কার করার যে অভিযান চালিয়েছিল তা সুলতান মুরাদ ১৩৭১ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর পণ্ড করে দেয়। এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় সুলতান মুরাদের দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট লালা শাহিন পাশা। লালা শাহীন পাশা রুমেলির প্রথম গভর্নর ছিলেন। ১৩৮৫ সালে বুলগেরিয়ার বিখ্যাত শহর সোফিয়া অটোমানদের কাছে পরাজিত হয়। ১৩৮৬ সালে একটি অটোমান বাহিনী প্লোনিক যুদ্ধে প্রিন্স লাজার হ্রেবেলজানোভিয়র কাছে খারাপভাবে হেরে যায়। এই যুদ্ধে অটোমান সেনাবাহিনী বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ১৩৮৯ সালে কসোভার যুদ্ধে সুলতান মুরাদের সেনাবাহিনী সার্বিয় সেনা ও তাদের মিত্রদের পরাজিত করে।

সুলতান মুরাদকে কখন, কোথায় ও কিভাবে হত্যা করা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। কিন্তু সমসাময়িক সূত্রগুলো থেকে জানা যায় যে কসোভার যুদ্ধে সুলতান মুরাদ ও যুবরাজ লাজার উভয়ই মৃত্যুবরণ করেন। বিভিন্ন পশ্চিমা সূত্র থেকে জানা যায়, যুদ্ধের প্রথম দিকেই সার্বিয়ান সেনা মিলো ওবিলি সুলতান মুরাদকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছিলেন। তবে বেশিরভাগ অটোমান ইতিহাসবিদ দাবী করেন যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে যুদ্ধের ময়দানে ঘুরতে গিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ফ্লোরেনটাইন সিনেটের বসনিয়ার রাজা ত্রভাত্কোকে ১৩৮৯ সালের ২০ অক্টোবর লেখা একটি চিঠিতে মুরাদের হত্যার বর্ণনা পাওয়া যায়। বারোজন সার্বিয়ান প্রভু একত্রিত হয়ে সুলতান মুরাদকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা সুলতানের দেহরক্ষীদের পরাজিত করে সুলতানের তাঁবুতে প্রবেশ করে এবং মিলো ওবিলি নামে তাদেরই একজন সুলতান মুরাদের গলা ও পেটে ছুরি চালিয়ে তাকে হত্যা করেন।

সুলতান মুরাদের মৃত্যুর পর যুদ্ধে অন্য একটি শাখায় দায়িত্বরত তার বড় ছেলে বায়েজিদ সুলতানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বায়েজিদ পিতার মৃত্যুর পর তার ভাই ইয়াকুবকে কমান্ড সেন্টারের তাঁবুতে ডেকে পাঠায়। সেখানে বায়েজিদ তার ভাইকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেন এবং সিংহাসনের একমাত্র দাবীদার হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।

সুলতান মুরাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলি কসোভোর মাঠে সমাহিত করা হয়েছিল এবং আজও যুদ্ধের ময়দানের এক কোণে মেশেদ-ই হুদাভেনদিগার নামে একটি স্থানে এই সমাধি রয়ে গেছে। এই স্থানটি স্থানীয় মুসলমানদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান। সুলতান মুরাদের দেহের অন্যান্য অবশেষগুলো আনাতোলিয়ার রাজধানী বুরসায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার নামে নির্মিত কমপ্লেক্সে সমাধিস্থ করা হয়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button