ইতিহাস

ডিডগরির যুদ্ধ: জর্জিয়ান রাজার হাতে সেলজুকদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়

ডিডগরির যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো জর্জিয়া কিংডম এবং গ্রেট সেলজুক সাম্রাজ্যের মধ্যে। আধুনিক জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসির ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে, ডিডগরি নামক যায়গায় এ যুদ্ধ হয়েছিল ১২ই আগস্ট, ১১২১ খ্রিস্টাব্দে। ডিডগরির যুদ্ধ মধ্যযুগীয় জর্জিয়ান স্বর্ণযুগের উদ্বোধন করেছিল এবং জর্জিয়ার ইতিহাসে এটি একটি “অলৌকিক বিজয়” হিসাবে উদযাপিত হয়। আধুনিক জর্জিয়ানরা এই অনুষ্ঠানটিকে বার্ষিক উৎসব হিসাবে স্মরণ করে যা ডিডগোরোবা নামে পরিচিত।

[embedyt] https://www.youtube.com/watch?v=aCwODq7WEWY[/embedyt]

জর্জিয়া কিংডম ১০৮০ এর দশক থেকেই গ্রেট সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। তবে, ১০৯০-এর দশকে, শক্তিশালী জর্জিয়ান রাজা ‘চতুর্থ ডেভিড’ সেলজুক সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অশান্তি এবং মুসলিম নিয়ন্ত্রিত পবিত্র ভূখন্ডের বিরুদ্ধে পশ্চিমা ইউরোপীয় প্রথম ক্রুসেডের সাফল্যকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তার সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ডেভিড ১০৯৭ সালে সেলজুকদের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি নিজেদের সুরক্ষার জন্য সেলজুক-তুর্কদের জর্জিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন এবং ১১০৩ থেকে ১১১৮ সাল পর্যন্ত জর্জিয়ার প্রধান প্রধান দুর্গগুলি সেলজুকদের থেকে উদ্ধার করেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিলো তিবলিসি পুনরুদ্ধার। তিবলিসি একটি প্রাচীন জর্জিয়ান শহর যা এর আগে চার শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। তিবলিসি আক্রমনের উদ্দেশ্যে ডেভিড শুরুর দিকে জর্জিয়ার বাইরেও তার সামরিক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। আরাক্স নদী অববাহিকা এবং ক্যাস্পিয়ান হ্রদের তটরেখা এবং দক্ষিণে ককেশাস অঞ্চল জুড়ে কিং ডেভিড তার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এতে করে পুরো অঞ্চল জুড়েই তার নামডাক ছড়িয়ে পরে। ১১২১ সালে কিং ডেভিড, তিবিলিসি শহর অবরোধ করেন। সেসময় তিবিলিসিতে অনেক মুসলমান আটকা পরে।

জর্জিদের সামরিক শক্তির এই পুনরুত্থানের ফলে সেলজুক মুসলিনরা চিন্তিত হয়ে পরে। তাদের ভূখন্ড তাদেত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে সেলজুকরা উৎকণ্ঠিত হয়ে পরেন। জর্জিয়ান এবং ইসলামী উভয় সূত্রই সাক্ষ্য দেয় যে, তিবিলিসির মুসলমানদের অবরোধের কারণে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ জর্জিয়ায় অভিযান প্রেরণ করেন। সেলজুকদের পক্ষে ছিলো মার্দিনের আরতুকিদ ইলগাজি, মাজইয়াদিদ দুবাইস দ্বিতীয় এবং সুলতানের ভাই তুঘরুল, এমিরেট অফ টিফলিস, শাহ আরমেন্স, শাদ্দাদিদস, আটাবেগস অফ আজারবাইজান প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী ও শাসকগণ। ইলগাজির নেতৃত্বে এই সম্মিলিত সেনাবাহিনী পূর্ব জর্জিয়ার ট্রায়েলেটি উপত্যকায় প্রবেশ করে এবং ১১২১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ডিডগরি ও মঙ্গলিসির আশেপাশে শিবির স্থাপন করে। অন্যদিকে কিং ডেভিডের পক্ষে ছিলো এল্যান মার্চেনারি, কুমান্স-কিপচ্যাক এবং ফ্র‍্যাঙ্কিশ নাইটদের সম্মিলিত এক শক্তিশালী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী।

সমকালীন ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলিতে অন্যান্য যুদ্ধের পাশাপাশি এ যুদ্ধের ঘটনাটি আলাদাভাবে উল্লেখিত হয়। কারণ এ যুদ্ধে সেলজুকরা এত বিশাল সৈন্য নিয়েও ক্ষুদ্র জর্জিয়ান সৈন্যদের সাথে পেরে ওঠে নি। আধুনিক সমরনীতির বিভিন্ন পাঠে এ যুদ্ধের গল্প উঠে আসে। ঐতিহাসিক সূত্রমতে কিং ডেভিডের সেনাবাহিনীর সংখ্যা অনুমান করা হয়েছে মোট ৫৫ হাজার। এর মধ্যে ৪০ হাজার জর্জিয়ান সেনা, ১৫ হাজার কুমান্স-কিপচ্যাক, ৫০০ অ্যালানস মার্চেনারি এবং ১০০ ফ্রাঙ্কিশ নাইট। এছাড়াও তারা আর্মেনিয়ান এবং শিরভানিজ মিত্রদের থেকে সাহায্য পেয়েছিলো। অন্যদিকে সেলজুকদের বাহিনী নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোনো সূত্র মতে তাদের সংখ্যা ২ লক্ষ থেকে প্রায় ৩ লক্ষ। আবার অন্য সূত্রমতে তাদের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ লক্ষ। কিছু কিছু সূত্রমতে এই সংখ্যা গিয়ে দাড়িয়েছে ৮ লক্ষে।

সময়টা ১২ই আগস্ট, ১১২১ খ্রিস্টাব্দ। দুই পক্ষেরই সেনাবাহিনী তিবিলিসির অল্প দূরে ডিডগরি উপত্যকায় মিলিত হয়েছে। যুদ্ধের আগে, ডেভিড তাঁর সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ অংশ তাঁর সেনাবাহিনীর দুই উইং এ মোতায়েন করেছিলেন যার একটি উইং তাঁর নিজের অধীনে এবং অন্যটি তাঁর পুত্র দেমেট্রিয়াসের অধীনে ছিল। তিনি এই উইংগুলি সেলজুকদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন যার ফলে সেলজুকরা শুধুমাত্র দৃশ্যমান জর্জিয়ান লাইনের কেন্দ্রের দিকে তাদের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। এই জর্জিয়ান কেন্দ্রও কম শক্তিশালী ছিলো না। সেখানে ছিলো কুম্যান্স-কিপচ্যাক এবং জেরুজালেমের ক্রুসেডার রাজা বাল্ডউইন প্রেরিত অতিরিক্ত অশ্বারোহী বাহিনীর একটি বিস্তৃত সৈন্যদল। এছাড়া কিং ডেভিডের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ ছিলো সেলজুক বাহিনীর সামনে জর্জিয়ান সৈন্যসংখ্যা কম দেখানো। আরব ঐতিহাসিক ইবনে আল-আতিরের মতে, কিং ডেভিড সময়ক্ষেপণের জন্য তার একটি ছোট বাহিনী সেলজুকদের উদ্দেশ্যে শান্তিচুক্তির আলোচনা করার জন্য প্রেরণ করে। এরই মধ্যে কিং ডেভিড তার সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ একত্রিত করে ফেলে। সেলজুক কমান্ডাররা ভাবে কিং ডেভিড বুঝি আত্মসমর্পণ করতে চায় তাই এই কূটনৈতিক বাহিনী প্রেরণ করেছে। এই তথ্য সেলজুক শিবিরে পৌছলে তারা যুদ্ধের মনোভাব ত্যাগ করে শান্তিচুক্তির কথা ভেবে এগিয়ে আসে। আর এ প্রস্তুতির অভাবকে কাজে লাগিয়ে কিং ডেভিড অতর্কিত আক্রমন করে বসে সেলজুক বাহিনীর ওপর।

কিং ডেভিডের বাহিনী সেলজুকদের ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে একই সাথে ক্রুসেডার অশ্বারোহী বাহিনী সেলজুক লাইনের সামনের অংশে আক্রমণ শুরু করে। সেলজুকরা যখন এই আক্রমণটির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য একজোট হয়, ঠিক তখনই জর্জিয়ান ভারী অশ্বারোহী লুকিয়া রাখা দুটি উইং সেলজুক সেনাবাহিনীর উভয় প্রান্তে আক্রমন শুরু করে। যুদ্ধের শেষ মুহুর্তে, কিপচ্যাকদের চূড়ান্ত আঘাত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় যার সম্মিলিত প্রভাব ছিল মারাত্মক। প্রাথমিক আঘাতেই অনেক সেলজুক কমান্ডার মারা গিয়েছিলেন। ইলগাজি আহত হয়েছিলেন কিন্তু পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কমান্ডারবিহীন সেলজুক বাহিনী নেতৃত্বহীন হয়ে পরে। যুদ্ধ শেষে সেলজুক সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ হয় মারা যায় নাহয় বন্দী হয়ে যায় জর্জিয়ানদের হাতে।

জয়ের পরে, ডেভিড মুসলিমদের প্রতিরোধের যা অবশিষ্ট রয়েছিলো তিবিলিসিতে তার বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং পরের বছর, ১১২২ সালে তিনি তিবিলিসিতে সর্বাত্মক আক্রমণ চালান। জর্জিয়ার কিংবদন্তি অনুসারে তখন এই শহরটি, “চিরকালের জন্য জর্জিয়ার রাজধানী” হয়ে ওঠে। মধ্যযুগীয় সূত্রগুলি তিবিলিসির মুসলমানদের বিরুদ্ধে ডেভিডের প্রতিশোধের কথা বলেন। তবে আরব ঐতিহাসিক আল-আযানী, এর মতে জর্জিয়ান রাজা শুরুর দিকে রাজ্য পুনরুদ্ধারের আশায় মুসলিমদের প্রতি ক্রুদ্ধ থাকলেও যুদ্ধ শেষে তিনি ধৈর্য দেখিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের অনুভূতিকে সম্মান করেছিলেন।

লেখকসাঈদ সিদ্দিকী মৃদুল ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button