ইতিহাস

বেঙ্গল সালতানাতের ইতিহাস | বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী দেশ ছিলা বাংলা

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপের এক শৌর্যশালী রাজ্য ছিলো এ বেঙ্গল সালতানাত। যার অপর নাম সুবাহ বাংলা অথবা শাহী বাঙ্গালাহ। সুবাহ বাংলার রাজধানী গৌড় এবং পান্ডুয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শহর। বেঙ্গল সালতানাতের দক্ষিণ-পশ্চিমে ওড়িশা, দক্ষিণ-পূর্বে আরাকান, এবং পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যসহ বেশ কয়েকটি ‘বিশাল স্টেট’ এই সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বেঙ্গল সালতানাত তার রাজ্য বিস্তারের চূড়ায় পৌছায়। এসময় উত্তর-পূর্ব দিকের কামরূপ-কামতা এবং পশ্চিমের জৌনপুর ও বিহার এ সালতানাতের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়। অর্থনৌতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ভাবে তৎকালীন সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছিল এ শাহী বাঙ্গালাহ। স্বাধীন সুলতানী আমলে বাংলাকে ধরা হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল হিসেবে। সেসময় বিশ্বের মোট জিডিপির ১২ শতাংশ উৎপন্ন হত এই সুবাহ বাংলায়, যা সে সময় সমগ্র ইউরোপের জিডিপির চেয়ে বেশি ছিল। সারা পৃথিবী থেকে এখানে ব্যবসায়ীরা আসতেন বাণিজ্য করার জন্য।

ইতিহাসে বাংলাকে “প্যারাডাইস অফ নেশনস” হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান এবং প্রকৃত মজুরি বিশ্বে সর্বোচ্চ ছিল। ইউরোপীয় মহাদেশের মোট আমদানিকৃত দ্রব্যের প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করতো এই সুবাহ বাংলা। বাংলার পূর্বাঞ্চল তাঁত শিল্প এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ছিল। বিশ্বের মোট আমদানিকৃত রেশম, সুতি কাপড়, ইস্পাত, লবণসহ নানা কৃষিজাত ও শিল্পজাত পণ্যের প্রধান রফতানিকারক ছিল এই অঞ্চল। এ অঞ্চলে কমপক্ষে ছয় প্রকারের সূক্ষ্ম মসলিন পাওয়া যেত। কাগজ প্রস্তুতিতেও বিখ্যাত ছিলো শাহী বাঙ্গালাহ। তুঁত গাছের ছাল থেকে উচ্চমানের কাগজ তৈরি হতো এ অঞ্চলে। বেঙ্গল সুলতানাতের প্রসিদ্ধ শহরগুলি ছিলো রাজকীয় রাজধানী গৌড়, যা সেসময় জনসংখ্যায় বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম শহর ছিলো। অন্যান্য শহরের মধ্যে আরেক রাজকীয় রাজধানী পান্ডুয়া, অর্থনীতির কেন্দ্র সোনারগাঁ, মসজিদের শহর বাগেরহাট, সমুদ্র বন্দর ও বাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুইশত বছর  

দিল্লির সুলতানগণ বাংলাকে তাদের অধিকারে রাখতে পারেনি। এ সময় বাংলার সুলতানগণ স্বাধীনভাবে এবং নিশ্চিন্তে বাংলা শাসন করতে পেরেছেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ এর মাধ্যমে এ স্বাধীনতার সূচনা হয় এবং ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানদের হাতে প্রথম স্থিতিশীলতা লাভ করে এ বাংলা। 

১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খানের মৃত্যু হয়। বাহরাম খানের বর্মরক্ষক ছিলো ‘ফখরা’ নামের একজন রাজকর্মচারী। প্রভুর মৃত্যুর পর তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ‘ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ’ নাম নিয়ে সোনারগাঁয়ের সিংহাসনে বসেন। এভাবেই সূচনা হয় বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের। পরবর্তী ২০০ বছর এ স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। দিল্লির শাসনকর্তাগণ সোনারগাঁয়ে ফকরুদ্দিন কর্তৃক এ স্বাধীনতার ঘোষণাকে সুনজরে দেখেনি। তাই দিল্লির প্রতিনিধি লখনৌতির শাসনকর্তা ‘কদর খান’ ও সাতগাঁয়ের শাসনকর্তা ‘ইজ্জউদ্দিন’ মিলিতভাবে সোনারগাঁও আক্রমণ করেন। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। ‘কদর খান’ ফখরুদ্দিনের সৈন্যদের হাতে পরাজিত ও নিহত হন। ফকরুদ্দিনপুত্র গাজি শাহ পিতার মৃত্যুর পর সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন এবং ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিন বছর রাজত্ব করেন।

অন্যদিকে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ এর সাথে যুদ্ধে কদর খান নিহত হলে লখনৌতির সিংহাসন দখল করেন সেখানকার সেনাপতি ‘আলী মুবারক।’ সিংহাসনে বসে তিনি ‘আলাউদ্দিন আলী শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। লখনৌতিতে তিনিও স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন। পরে রাজধানী স্থানান্তর করেন পান্ডুয়ায়। আলি শাহ ক্ষমতায় ছিলেন ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তার দুধ ভাই ‘হাজী ইলিয়াস’ ‘আলি শাহ’ কে পরাজিত ও নিহত করে ‘শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ’ নাম নিয়ে বাংলায় একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাজবংশের নাম ইলিয়াস শাহী বংশ। এরপর ইলিয়াস শাহের বংশধরগণ অনেকদিন বাংলা শাসন করেন।

১৩৫২ সালে ফকরুদ্দিনপুত্র গাজি শাহ এই ইলিয়াস শাহের হাতে পরাজিত হন। এতে সোনারগাঁও সহ সমগ্র বাংলা ইলিয়াস শাহের অধীনে আসে। তাই বলা হয়ে থাকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ বাংলার স্বাধীনতার সূচনা করলেও প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে। কারণ ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ শুধুমাত্র সোনারগাঁও অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। সমগ্র বাংলা তার করায়ত্ত ছিলো না।  ইলিয়াস শাহ লখনৌতির শাসক হিসেবে বঙ্গ অধিকার করে দুই ভূখণ্ডকে একত্রিত করে বৃহত্তর বাংলা সৃষ্টি করেছিলেন। এসময় থেকেই বাংলার সকল অঞ্চলের অধিবাসী ‘বাঙালি’ বলে পরিচিতি পায়। ইলিয়াস শাহ ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ও ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি গ্রহণ করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। ইলিয়াস শাহ যে স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সিকান্দার শাহ সেভাবেই একে আরো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হন। সুলতান সিকান্দার শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দিন ‘আজম শাহ’ উপাধি গ্রহণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন।পারস্যের প্রখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তার পত্রালাপ হতো। তার রাজত্বকালেই প্রথম বাঙালি মুসলমান কবি শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ কাব্য রচনা করেন। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন বঙ্গের শ্রেষ্ঠ সুলতানদের মধ্যে অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান। তার মৃত্যুর পর থেকেই এ বংশের পতন শুরু হয়।

সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে বাংলার ইতিহাসের ২০০ বছর, ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলমান সুলতানদের স্বাধীন রাজত্বের যুগ। তথাপি এই ২০০ বছরের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য এক হিন্দু রাজা বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সুযোগে দিনাজপুরের ভাতুলিয়া অঞ্চলের রাজা গণেশ বাংলার সিংহাসন দখল করেন। রাজা গণেশ অনেক সুফি-সাধক কে হত্যা করেন। মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য তৎকালীন মুসলিম নেতা ‘নূর কুতুব-উল আলম’ জৌনপুর এর সুলতান ইব্রাহিম শর্কির নিকট আবেদন জানান। ইব্রাহিম শর্কি সসৈন্যে বাংলায় উপস্থিত হলে গণেশ ভয় পেয়ে আপোস করতে বাধ্য হন। শর্ত অনুযায়ী গনেশ তার ছেলে যদুকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন এবং ছেলের হাতে বাংলার সিংহাসন ছেড়ে দেন। মুসলমান হওয়ার পর যদুর নাম হয় জালালউদ্দিন মাহমুদ শাহ। জালালউদ্দিন মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শামসুদ্দিন আহমেদ শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে আহমদ শাহ তার অমাত্যবর্গের ষড়যন্ত্রে নিহত হন। এভাবে রাজা গণেশ ও তার বংশধরদের প্রায় ত্রিশ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে। 

এই পর্যায়ে বাংলার সিংহাসন নিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে অভিজাতবর্গ ‘মাহমুদ’ নামে ইলিয়াস শাহের এক বংশধরকে ১৪৫২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসান। ইতিহাসে তিনি নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ নামে পরিচিত। ইলিয়াস শাহের বংশধরগণ এভাবে পুনরায় স্বাধীন রাজত্ব শুরু করেন। তাই এই যুগকে বলা হয় পরবর্তী ইলিয়াস শাহী যুগ। ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ মৃত্যু বরণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র রুকনুদ্দিন বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। বরবক শাহ অসংখ্য আবিসিনীয় অর্থাৎ হাবসি ক্রীতদাস সংগ্রহ করে সেনাবাহিনী ও রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। নিয়োগকৃত এ হাবসি ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল আট হাজার। কিন্তু তার এ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যের জন্য বিপদ ডেকে আনে। এ বংশের শেষ সুলতান ছিলেন জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ। তার সময় রাজদরবারে দুর্যোগ দেখা দেয়। হাবসি ক্রীতদাসরা এ সময় খুব ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। তারা একজোট হয়ে ষড়যন্ত্র করে সুলতানকে হত্যা করে। ফতেহ শাহ নিহত হলে বাংলার সিংহাসনে ইলিয়াস শাহী বংশের শাসনকালের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এরপর বাংলায় হাবসিদের রাজত্বের সূচনা হয়। বাংলায় হাবসি শাসন মাত্র ছয় বছর স্থায়ী ছিল। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ পর্যন্ত। এই সময়ে এদেশের ইতিহাস ছিল অন্যায়, অবিচার, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র আর হতাশায় পরিপূর্ণ। এ সময়ের চারজন হাবসি সুলতানের মধ্যে তিনজনকেই হত্যা করা হয়। 

হাবসি যুগ শেষে বাংলার মসনদে আসে হোসেন শাহী বংশ নামে নতুন এক রাজবংশ। ১৪৯৩ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী এ হুসেন শাহী আমল ছিল বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে গৌরবময় সময়। এ বংশের প্রথম সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। সিংহাসন লাভের পর হুসেন শাহ হাবসিদের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আলাউদ্দিন হুসেন শাহ রাজ্যের কল্যাণের লক্ষ্যে বঙ্গের রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে হাবসিদের প্রভাব মুক্ত করতে যেমন সচেষ্ট ছিলেন। বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে একমাত্র তিনিই পান্ডুয়া বা গৌড় ব্যতীত অন্যত্র রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ও বিকাশ, হুসেন শাহের শাসনামলকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। এযুগের প্রখ্যাত কবি ও লেখকদের মধ্যে সনাতন গোস্বামী, মালাধর বসু, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস, পরাগল খাঁন, যশোরাজ খান উল্লেখযোগ্য ছিলেন। হোসেন শাহের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র নুসরত শাহ। নুসরাত সাহের শাসনকালের বহু স্থাপত্যকীর্তি, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার পরিচয় বহন করে। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। নুসরাত শাহের উত্তরাধিকারগণ ছিলেন দুর্বল। তার মৃত্যুর পর থেকেই হুসেন শাহী বংশের পতনের শুরু হয় এবং অবশেষে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে আফগান নেতা শের শাহ শূর গৌড় দখল করলে বাংলার দুইশত বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগের অবসান ঘটে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button