আন্তর্জাতিকইতিহাস

অখন্ড ভারত নীতি – বাস্তবতা নাকি বাতুলতা

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে কোন সাম্রাজ্যই সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি নির্দিষ্ট শাসনের অধীনে আনতে পারেনি। মৌর্য সাম্রাজ্য, মোঘল সাম্রাজ্য, কিছুক্ষেত্রে গুপ্ত সাম্রাজ্যও হয়তো কাছাকাছি গিয়েছিলো তবে সমগ্র ভারতবর্ষ জয় করতে কোনো সাম্রাজ্যই সক্ষম হয়নি। আর ব্রিটিশদের কথা বলতে গেলে ব্রিটিশদের ক্ষেত্রেও এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। গোয়া, পন্ডিচেরির মত কিছু কিছু অঞ্চল পর্তুগিজ, ফরাসিদের অধীনে ছিল। এছাড়া সমগ্র ভারতবর্ষের অর্ধেক অংশই কমবেশি স্বায়ত্তশাসিত মহারাজদের অধীনে ছিল। এছাড়া আরেকটি বিষয় হলো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সরাসরি ভারতীয় সাম্রাজ্য না, এটা পরিচালিতও হতো না ভারতবর্ষ হতে, আর ব্রিটিশ শাসনের শুরুর ১০০ বছর ছিলো কোম্পানীর শাসন। সুতরাং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকেও এক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা যায় না যে তারা সমগ্র ভারতবর্ষ জয় করেছিলো। তবে ব্রিটিশদের ক্ষমতা এবং প্রভাবের দিক দিয়ে বলতে গেলে তারা ছিলো পূর্বের সকল সাম্রাজ্যের চাইতে বেশি শক্তিশালী। 

দেশভাগের পূর্বে, স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিকে আলাদা করে হিন্দুরাস্ট্র ভারত এবং মুসলিম রাস্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির কোনো কথা ছিলো না। ১৭৫৭ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রশ্নে দেশ-ভাগের কোনো ধারণাও তখন সৃষ্টি হয় নি। তাই আপাতদৃষ্টিতে অনেকে ব্রিটিশ ভারতের এই ধর্মীয় সহনশীলতাকেই অখন্ড ভারত রুপে আখ্যা দেন। ১৮৮৫ তে কংগ্রেসের সৃষ্টির ফলে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে একটা মুসলিম জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটতে শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে বঙ্গভঙ্গের ঠিক পরের বছরই মুসমিল লীগ প্রতিষ্ঠা হয়। তখন থেকেই শুরু হয় ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের বীজ বপন। আর ১৯৩৩ এ চৌধুরী রহমত আলীর এক বইয়ে সর্বপ্রথম “পাকিস্থান” শব্দের উল্লেখ সেই ধারণাকে আরো বলবৎ করে।

অখন্ড ভারত নিয়ে আরো কিছু তথ্য দেওয়ার আগে এই ধারণার উদ্ভব সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। অখন্ড ভারতের ধারণা মূলত এসেছে বিখ্যাত চরিত্র চাণক্যের লেখা থেকে। ভারতীয় জাতির ইতিহাসে চাণক্য(অপর নাম কৌটিল্য) এক অবিস্মরণীয় নাম। তার কূটনীতি, দেশ পরিচলানার কলাকৌশল এখন পর্যন্ত সমাদৃত। তার এক ভারত বলতে তখন একটি স্থান বুঝানো হতো যা আজকে ভারতীয় উপমহাদেশ হিসেবে পরিচিত। চাণক্যের সময়কাল আজ থেকে প্রায় ২৩০০ বছর আগে। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলটি বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য এবং সাম্রাজ্যে বিভক্ত ছিল। চাণক্য বিশ্বাস করতেন সমগ্র অঞ্চলটিকে একটি নির্দিষ্ট শাসন, প্রশাসন এবং কর্তৃত্বের অধীনে আনতে হবে। তিনি তার শিষ্য, মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মাধ্যমে তার স্বপ্নের পথে অনেক দূর এগিয়েও যান। এরপর চন্দ্রগুপ্তের নাতি অশোক প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষকে পাঁচ দশকের জন্য তার করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর খুব দ্রুতই মৌর্য সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। এরপর গুপ্ত সাম্রাজ্য, পরবর্তীতে মোঘল এবং ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের অনেকটুকু দখল করতে পারলেও সম্পূর্ন দখল করতে কেউই পারে নি।

“অখন্ড ভারত” শব্দগুচ্ছটি আসলে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের একটি ধারণা ও বিশ্বাস। তাদের বিশ্বাস অনুসারে বর্তমান ভারতের পাশাপাশি অবস্থিত দুই দেশ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ (অনেকক্ষেত্রে নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ এমনকি আফগানিস্থান, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এসকল দেশকেও বিবেচনায় আনা হয়) হচ্ছে ভারতেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহাসিক এবং কৃষ্টিগত দিক দিয়ে ভারতের সাথে মিল থাকায় এই সকল দেশকে ভারতের সাথে যোগ দিতে হবে। অখন্ড ভারতের ধারণায় বিশ্বাসীদের যুক্তি হল এসকল দেশ একসময় হিন্দু ধর্ম দ্বারা (কারো কারো মতে বৌদ্ধ ধর্মও বিবেচ্য) প্রভাবিত ছিল। সুতরাং এই সকল অঞ্চল গুলোকে ভারতের সাথে যোগ দিতে হবে এবং সম্ভব হলে এখানকার বাসিন্দাদের সনাতন ধর্মে ফেরত যেতে হবে।

বলাই বাহুল্য অখন্ড ভারতের স্বপ্ন সম্পূর্ণরূপে বাস্তবতা বর্জিত। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়, অখন্ড ভারত বলতে হিন্দুত্ববাদী সংঘটন যা বোঝায় তা কখনোই সম্ভব নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ, পাকিস্তানের, নেপাল, ভূটানের ভারতের সাথে যুক্ত হয়ে একটি অভিন্ন দেশ গঠন- এ ধারণাটি নিকট ভবিষ্যতে সম্ভন নয় বলাই চলে। তবে একক দেশ হিসেবে কল্পনা না করে যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা আমাদেরই নিজস্ব সার্কের আদলে, প্রভাবশালী এবং বাস্তবিকভাবে কার্যক্ষম একটি আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিন্তা করা হয় সেক্ষেত্রে অখন্ড ভারতের ধারণা অনেকটাই বাস্তবে রূপ নেয়। তবে এখানে বলে রাখা ভালো, সেই প্রতিষ্ঠানের “অখন্ড ভারত” নামধারণ করা অনেকটা স্বপ্নেরই নামান্তর। তারচেয়ে বরং একটি কেতাবী নামের আড়ালে ভারতবর্ষের সেই পুরোনো সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা, ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন ফিরে আসুক এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে আরো এগিয়ে যাক সেই আশা করাই বাস্তবসম্মত।

বর্তমানে চীন এবং ভারতের পরস্পরবিরোধী অবস্থান, ভারতকে চাপের মুখে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের উচিত তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে যতটা সম্ভব সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আপাতত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আঞ্চলিক জোটের খসড়া সামনে না এলেও, ভারত যে সেটার জন্য চেষ্টা করবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আর পার্শবর্তী দেশগুলোর সাথে বিশেষ করে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বাণিজ্য-বিমিময় পূর্বের তুলোনায় অনেক বেড়েছে। যদিও এই বাণিজ্য-বিনিময়ে বাংলাদেশের লাভের হার তুলনামূলকভাবে কম, তবে কার্যকরী এবং সময়োপযোগী কূটনীতি এই বাণিজ্য-বিনিময়ের ফলাফল বাংলাদেশের পক্ষে আনতে সক্ষম। এছাড়া বাংলাদেশের এখন সময় নেপাল এবং ভূটানের সাথে ভারতের সাম্প্রতিক টানাপোড়নকে কাজে লাগিয়ে এই দুই দেশের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং ভারতকে তার অভিভাবকসুলভ আচরণ করা থেকে বিরত রাখা।

লেখক – সাঈদ সিদ্দিকী মৃদুল  ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button