ইতিহাস

সিলেট যেভাবে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হলো।

“বিশ্ব কবির ‘সোনার বাংলা’, নজরুলের ‘বাংলাদেশ’, জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’  রূপের যে তার নেইকো শেষ।”

সত্যিই বাংলাদেশের রূপের শেষ নেই। রূপসী বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত সিলেট। “দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ” “৩৬০ আউলিয়ার দেশ” এরকম হাজারো পরিচয়ে পরিচিত জেলাটি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রাখছে। সিলেট বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ। কিন্তু সবসময়ের জন্যই কি সিলেট আমাদেরই ছিলো? না, সিলেটের রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পাতায় পাতায় উল্লেখ রয়েছে সিলেটের গল্প, দেশভাগের গল্প, করিমগঞ্জের গল্প।

৪৭ এ দেশভাগের সময় তৎকালীন রাজনীতিবিদ ও ব্রিটিশদের ক্ষমতার দাপটে কাটাতারের সীমানায় বিশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের ইচ্ছে বা দাবীর  প্রতিফলন ঘটেছিলো খুব সামান্যই। তবে যে গুটিকয়েক অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজেদের  ইচ্ছায় তাদের পছন্দসই দেশ বেছে নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলো তার মধ্যে সিলেট অন্যতম। সিলেট পাকিস্তানে যোগ দেবে নাকি ভারতে তা নিয়ে ৪৭ এ গনভোট হয়। গনভোটের ফলস্বরূপ সিলেট, ভারতের আসাম ত্যাগ করে যোগ দিয়েছিলো পূর্ব-পাকিস্তানে।

‘৪৭ এর সেই কালজয়ী গণভোট আর আজকেরে এই সিলেট, কীভাবেই বা করিমগঞ্জ আলাদা হয়ে গেল সিলেট থেকে। ইতিহাসের সেইসব পাতায় চোখ রাখবো আজ।

ভৌগোলিকভাবে পাশাপাশি অঞ্চল হওয়ায়, শিল্প সাহিত্য, ভাষা-সংস্কৃতি নানা ক্ষেত্রে সিলেটের সাথে আসাম প্রদেশের বেশ সাদৃশ্য ছিলো বলা যায়। সেজন্য ১৮৭৪ সালে অহমিয়া ভাষা-ভাষীদের নিয়ে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয় সিলেটকে। চা শিল্পসমৃদ্ধ এই অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিলো আর্থ-সামাজিক ভাবে শক্তিশালী একটি প্রদেশ গঠন। কিন্তু আসামের হিন্দু এবং মুসলমানেরা দেখিয়েছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এহেন অবস্থায় হিন্দু-মুসলিমের মতপার্থক্যে দেশভাগ অবধি আসামের অংশ হয়েই রয়ে যেতে হয় সিলেটকে। পরবর্তীতে ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ এবং আসাম এই দুই প্রদেশকে এক করে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। যার রাজধানী হিসেবে বেছে নেয়া হয় ঢাকাকে। তবে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরোধীতায় ৬ বছরের মাথায় বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। যার ফলে সিলেট  আবারও স্বতন্ত্র আসামের অংশ হয়েই থেকে যায়। 

দেশভাগের সময় ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও শিখ নেতাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু-মুসলিম দুটি আলাদা ধর্মের ধর্মীয় বিভাজনকে সামনে রেখে দেশভাগ করা।

সেই আলোচনায় ঠিক হয়, হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ  আসাম এর পুরোটা পাবে ভারত তবে আসামের একটি জেলা, সিলেট, যেখানে ধর্মীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলো না, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে তার জনগণ। সিলেট আসামের সাথেই থাকবে নাকি পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব-পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবে তা জানার জন্য এই আলোচনার ঠিক এক মাস পর অর্থাৎ ৩রা জুলাই লর্ড মাউন্টব্যাটেন আসামে গণভোট আয়োজনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেন।

গণভোটের সিদ্ধান্ত আসার পর ভোটগ্রহণের দিন  ধার্য করা হয় ৬ ও ৭ তারিখ। ২৩৯ টি কেন্দ্রের জন্য ৪৭৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার ও ১৪৩৪ জন পোলিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়।

ভোট বাক্সের মার্কা নির্ধারণ করা হয় কুড়াল (পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবার পক্ষে) ও কুঁড়েঘর (আসাম তথা ভারতের সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে)। সমগ্র সিলেটে ভোটার ছিলো মোট ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫। ভোটগ্রহণের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায় পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে অর্থাৎ কুড়াল মার্কায় ভোট পরেছে ২,৩৯,৬১৯ টি আর আসামে থেকে যাবার পক্ষে অর্থাৎ কুঁড়েঘর মার্কায় ভোট এসেছে ১,৮৪,০৪১ ভোট। শতাংশের দিক দিয়ে প্রায় ৫৭ শতাংশ সিলেটবাসী পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার পক্ষে অবস্থান করে।

তবে সমস্যা দেখা দেয় করিমগঞ্জ মহকুমাকে নিয়ে। ১২ আগস্টে প্রকাশিত র‍্যাডক্লিফ লাইন অনুসারে করিমগঞ্জ মহকুমার অধিকাংশ এলাকাকেই ভারতের অংশে দেখানো হয়, যা ছিলো গনভোটের ফলাফলের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি সিদ্ধান্ত। করিমগঞ্জ মহকুমায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন ছিল তেমনভাবে ভোটগ্রহণের সময়েও করিমগঞ্জবাসী পূর্ববঙ্গে যোগদানের পক্ষে ছিলো। কিন্তু এতকিছু সত্বেও গণভোটের ফলাফল ও পূর্বপ্রতিশ্রুতি অবজ্ঞা করে করিমগঞ্জ মহকুমার ৪ টি থানার মধ্যে করিমগঞ্জ, বদরপুর, পাথর কান্দি, রাতাবাড়ির মধ্যে তিনটির পুরোপুরি ও একটির অর্ধেক ভারতকে দিয়ে দেয়া হয়। যেখানে ভোটের ফলাফল অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ হলে করিমগঞ্জ মহকুমা আজকে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের অংশ হতো পারতো। তবে করিমগঞ্জ ব্যতীত সিলেটের বাকি এলাকা সেই থেকে পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত হলো এবং ‘দু’টি পাতা, একটি কুঁড়ির’ অপরুপ সৌন্দর্যের সিলেট বাংলাদেশের এক সমৃদ্ধশালী জেলায় পরিণত হলো।

লেখক – সাঈদ সিদ্দিকী মৃদুল  ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button