আন্তর্জাতিকইতিহাসসাম্প্রতিক

বৈরুত বিস্ফোরণের আদ্যোপান্ত | কেন এবং কিভাবে হল এই বিস্ফোরণ

বিকেল গড়িয়ে ঘড়ির কাটা সবে ৬ এর ঘরে। সন্ধ্যা হবে হবে করছে। হঠাৎ এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেপে উঠলো গোটা শহর। বলছিলাম গত ৪ আগস্ট লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের কথা। বিস্ফোরণের তীব্রতায় এটি ১৯৪৫ সালের হিরোশিমা নাগাসাকি পারামানবিক বিস্ফোরণের ঠিক পরেই অবস্থান করবে। শুধু এ কথা থেকেই ধারণা করা যাচ্ছে বিস্ফোরণের তীব্রতা এবং ভয়াবহতা কতটা মারাত্মক ছিলো। প্রাথমিকভাবে লেবাবন সরকার এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে সমুদ্র বন্দরের গুদামে থাকা দাহ্য রাসায়নিক থেকে বিস্ফোরণটি ঘটেছে। এ ঘটনার পর লেবানন সরকার জনগণের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তবে লেবানন সরকার যাই বলুক না কেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশের বড় বড় নেতা এবং বেশ কিছু নামীদামী সংবাদপত্রের বরাত অনুযায়ী এ বিস্ফোরণ কোনো দূর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত এক হামলা। 

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবানননের সীমানা সিরিয়া এবং ইসরাইলের সীমানার সাথে লাগোয়া। লেবাননের রাজধানী বৈরুত ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি শহর। বৈরুত বন্দরে সেদিন প্রথমে একটা অগ্নিকাণ্ড এবং সেইসাথে প্রচুর ধোঁয়া দেখা যায়। অনেকেই সেই ধোয়া এবং অগ্নিকান্ডের দৃশ্য নিজেদের স্মার্টফোনে ধারণ করতে থাকেন। ধোঁয়ার বিশাল কুন্ডলী সত্ত্বেও একটু পর ঠিক কি ঘটতে যাচ্ছে তা বোধহয় কেউই পুরোপুরি কল্পনা করতে পারে নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে বন্দরের যে গুদামে আগুন লেগেছিল তার মধ্যে ছিল আতশবাজি ও অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এর মত রাসায়নিক। প্রথমে আতশবাজির মধ্যে ছোট্ট একটি বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনার ধোঁয়ার মধ্যে আতশবাজির আলোর ঝলক দেখা যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণে চারদিকের প্রায় ৫ কিমি এলাকা সম্পূর্ণ লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ১০ কিমি দূর থেকেও সরাসরি এ বিস্ফোরণ দেখা যায় এবং প্রায় ১৫ কিমি দূর পর্যন্ত শকওয়েভ আঘাত আনে। এমনকি বৈরুত থেকে প্রায় ২৪০ কিমি দূরের দেশ সাইপ্রাসেও এই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আর সাইপ্রাস দ্বীপ মৃদু ভূমিকম্পের মত কেপে ওঠে। বিস্ফোরণের ফলে প্রায় আড়াই শতাধিক লোক নিহত হয় এবং পাঁচ হাজারের বেশি লোক আহত হয় এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো অনেক। বৈরুত শহরের বিশাল অংশ সম্পূর্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। শহরের বহু ভবনের দরজা জানালা ভেঙ্গে গেছে। এবং রাস্তায় থাকা অসংখ্য গাড়ি রীতিমত দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। এত বিপুল পরিমান ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে প্রায় তিন লক্ষেরও বেশি লোক গৃহহীন হয়ে পড়েছে। 

বৈরুত বন্দরের গুদামে মজুদকৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের কারণে বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নামটির সাথে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত। এটি সাধারণত  সার উৎপাদনেই বেশি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বহু শিল্প কারখানায় এর ব্যবহার আছে। অ্যামোনিয়াম নাইট্রাইট সরাসরি কোন বিস্ফোরক পদার্থ নয়। তবে এটি একটি অক্সিডাইজার। অক্সিডাইজার মানে হলো এটি আগুনে আরো অধিক পরিমাণ অক্সিজেন টেনে এনে আগুনকে জ্বলতে সাহায্য করে। 

২০১৩ সালে একটি রাশিয়ান কার্গো জাহাজ ২৭৫০ টন অ্যামোনিয়া সহ বৈরুত বন্দরে আসে। অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতায় বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করে এবং জাহাজে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, বন্দরের একটি গুদামে মজুদ করা হয়। দীর্ঘ সাত বছরেও এ বাজেয়াপ্ত রাসায়নিকের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মাত্র কয়েক মাস আগে গুদাম পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা বলেছিলেন এখানে দূর্ঘটনা ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আর তারা আশঙ্কা করেছিলেন এখানে দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো বৈরুত শহর তছনছ হয়ে যেতে পারে। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হল। 

তবে অনেকেই একে দুর্ঘটনা নয় হামলা হিসেবে দেখছেন। এই বন্দরটি ছিল সমগ্র লেবাননের ৮৫% খাদ্য শস্যের ভান্ডার। এছাড়া এখানেই ছিল জরুরী খাদ্যের মজুদ। তাই বৈরুতের সামান্য ক্ষতিও লেবাননের অর্থনীতির জন্য বেশ বড় ধরণের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। লেবানন সরকারের মদদপ্রাপ্ত হিজবুল্লাহ এর সাথে ইসরাইলের খারাপ সম্পর্ককে ভিত্তি হিসেবে ধরে অনেকেই তাই এই ঘটনাকে ইসরাইলের হামলা হিসেবে দেখছেন। তবে প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট করে আন্তর্জাতিক মাধ্যমে প্রকাশ পায় নি।  

দীর্ঘদিন থেকেই লেবাননের অর্থনীতি ভঙ্গুর প্রায়। লেবাননের প্রায় অর্ধেক লোক ইতমধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। লেবাননে রয়েছে বেশ বড় এক বাংলাদেশি কমিউনিটি। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো শোচনীয়। সাম্প্রতিক করনা মহামারীর কারণে দেশটির অর্থনীতি চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি লেবাননের সরকার এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। তাই জনগণের পক্ষে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা কাটিয়ে ওঠা মোটেও সহজ নয়। এই ধ্বংসযজ্ঞ সরিয়ে শহর পুনর্নির্মাণ করতে কয়েক হাজার কোটি টাকার দরকার হবে। তাৎক্ষণিক সহযোগিতার জন্য বেশ কিছু দেশ তাদের সাহায্য পাঠাতে শুরু করেছে। বিদেশী দাতা রাষ্ট্রগুলোকে লেবাননের জনগণ বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে সাহায্য পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছে। তারা লেবাননের সরকারকে বিশ্বাস করছে না। তারা চায় না এসব সাহায্য সরাসরি সরকারের হাতে পৌঁছাক। কারণ জনগণ মনে করে লেবাননের রাজনীতিবিদ এবং দুর্নীতিবাজ সরকারের অবহেলার কারণেই এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

উল্লেখ্য যে এই বিস্ফোরণের কয়েক মাস আগে থেকেই লেবানন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিল। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে এই করোনার মধ্যেও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারনে তখন সে বিক্ষোভের সংবাদ ততটা গুরুত্ত্বসহ আন্তর্জাতিক মাধ্যমে আসে নি। তবে এই বৈরুত বিস্ফোরণের পর সকল সংবাদমাধ্যমের চোখ লেবাবনের দিকে। এতদিন ধরে চলা লেবানন সরকারের দূর্নীতি, জনগণের অসন্তোষ সবকিছু সামনে বেড়িয়ে আসছে এক এক করে। এরই প্রেক্ষিতে লেবাননের আইনমন্ত্রী মারিয়া ক্লাউদে নাজিম, তথ্যমন্ত্রী মানাল আব্দেল সামাদ ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রী ড্যামিয়ানোস কাত্তার তাদের নিজ নিজ পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। আর গত সোমবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব। ওই বৈঠকের পর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীপরিষদ পদত্যাগের ঘোষণা দেয়।

দূর্ঘটনা বা হামলা যাই ই হোক, তা এখনো স্পষ্ট প্রমানসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে না আসায় এখনি নিশ্চিতভাবে কোনো কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে দেশটির দূর্নীতি যে চরম পর্যায়ে পৌছেছিলো তা সহজেই অনুমেয়। তারই পরিপ্রেক্ষিত এই প্রতিবাদ, পদত্যাগ এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে লেবাননের পথযাত্রা।

লেখক- সাঈদ সিদ্দিকী মৃদুল ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button