জীবনী

হযরত নূহ আ: এর জীবনী এবং মহাপ্লাবনের ইতিহাস

রাসূলদের মধ্যে সর্বপ্রথম রিসালাতের দায়িত্ব পেয়েছিলেন হযরত নূহ আ.। যাকে মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা বলা হয়। হযরত নূহ আ. ছিলেন আদম আ. এর দশম বা অষ্টম অধস্তন পুরুষ। আদি মানব আদম আ. এর সাথে নূহ আ. এর ব্যবধান ছিল প্রায় ১০ শতাব্দী। নূহ আ. একাধারে ৯৫০ বছর তার কওমকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন।
হযরত নূহ আঃ এর জন্ম বর্তমান ইরাকের মুছেল নগরীর উত্তর প্রান্তে। নূহ (আঃ) এর প্রকৃত নামের ব্যাপারে নানা মত লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ বলেছেন তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবদুল গাফফার। আবার কারো মতে, ‘ইয়াশকুর’। অনেক পন্ডিতদের মতে, তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবদুল জব্বার। কেউ কেউ তাঁর নাম ইদ্রীস ছিল বলেও মত প্রকাশ করেন।হযরত নূহ আ. তাঁর উম্মতের গুনাহের জন্য অধিক কাঁদতেন বিধায় তাঁর নাম হয় নূহ।  নূহ (আঃ)-এর চার পুত্র ছিলঃ সাম, হাম, ইয়াফিছ ও ইয়াম অথবা কেন‘আন। প্রথম তিনজন ঈমান আনেন। কিন্তু শেষোক্ত জন কাফের হয়ে প্লাবনে ডুবে মারা যায়।
আদম আ. এর দুনিয়ায় আবির্ভাবের পর মানুষের মাঝে শিরক কুফর ছিল না বললেই চলে। তখন মানুষ পৃথিবী আবাদকরণ ও নানা মানবিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। কালের বিবর্তনে মানুষের মাঝে শিরক কুফরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মানুষ এক আল্লাহর একত্ববাদ ছেড়ে নানা জিনিসের পূজা করা সহ ইসলামের নানা বিধার অস্বীকার করা শুরু করে।বিশেষ করে হযরত নূহ আ. এর উম্মতদের থেকে প্রভলভাবে এই কাজের সূত্রপাত ঘটে। ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছসহ নানা গোত্রের মানুষ কবর এবং মানুষের মূর্তি বানিয়ে তাদের পূজা করা শুরু করে। কালক্রমে তাদের কাছ থেকেই আরবদের নিকট মূর্তিপূজার উপস্থিতি ঘটে। নূহ আ. এর কওম নানাবিধ সামাজিক অনাচারে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল। এই জাতিকে গোমরাহী থেকে মুক্ত করার জন্যই আল্লাহ নূহ আ. কে প্রেরণ করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে অনেক আয়াত নাজিল হয়েছে।


যুগে যুগে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন অনেক জাতিকেই তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তদ্রুপ এই জাতিকেও ধ্বংস করার আগে তাদেরকে সতর্ক করার জন্য উক্ত কওমের নিকট আল্লাহ পাক নূহ আ. কে পাঠান। নূহ আ. তাদেরকে বললেন হে আমার জাতি! আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী’। ‘ তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর’। এতে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুযোগ দিবেন। কিন্তু আল্লাহর নির্দিষ্ট সময় এসে গেলে তোমরা আর সুযোগ পাবে না।
নূহ আ. তাঁর উম্মতদের নানা বিষয়ে উপমা দেয়ার মাধ্যমে এক আল্লাহর একত্ববাদের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেন। তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য নেয়ামতের বর্ণনা দিয়ে তাদের বুঝাতে চাইতেন। দিন-রাত প্রকাশ্যে-গোপনে স্বীয় উম্মতদের দাওয়াত দিতে থাকেন নূহ আ.। কিন্তু তাঁর ফল খুব হতাশাজনক। লোকেরা তাঁর দাওয়াতে অতিষ্ট হয়ে পালিয়ে যেত, কানে আঙুল দিয়ে রাখত অশ্রাব্য ভাষায় গালি গালাজ করত। 
একবার তাদের গোত্র প্রধানরা সাধারণ মানুষদের ডেকে আনল। তাদের বলা হয় যে তোমরা তোমাদের পূর্ব পুরুষদের দেখানো পথ থেকে বিন্দু পরিমানও সরবে না। তাদের দেখানো ধর্মেই তোমরা অটল থাক। এরপর থেকে লোকেরা নূহ আ. এর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত শুরু করে। তারা নূহ আ. এর উপর নানা অভিযোগ উত্থাপন করে। যেমন তারা বলতে লাগল যে আপনি তো আমাদের মতই মানুষ নবী হলে তো আপনি ফেরেশতা হতেন। আমাদের গোত্রের হীন ও কম বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরাই আপনার অনুসারী। আপনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতা লাভ করা। আর আপনি যে দাওয়াত দিচ্ছেন তা আমাদের বাপ দাদাদের দেখানো পথ বিরোধী। সুতরাং আপনি মিথ্যাবাদী।
গোত্রপ্রধানগণ আরো নানা অপপ্রচার চালিয়ে জনগনকে নূহ আ. এর উপর ক্ষেপিয়ে তোলে। নূহ আ.ও তাদের এসব আপত্তির জবাব দিয়েছিলেন। তিনি বললেন হে আমার কওম আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল পাওয়ার পরও তোমরা যদি আমার কথা না শোন তাহলে আমি তোমাদের উপর জোরপূর্বক কোনকিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। কোন গরীব অসহায় ব্যক্তি যদি আমার ডাকে সাড়া দেয় আমি তাকে কোনভাবেই ফিরিয়ে দিতে পারি না। যদি আমি এমনটা করি অবশ্যই আমার প্রতিপালকের কাছে আমি জবাবদিহি করা লাগবে।আমি দাওয়াদের বিনিময়ে তোমাদের নিকট কোন সম্পদ, ক্ষমতা, বিনিময় কিছুই চাই না। আমার পুরস্কার আল্লাহ পাকের কাছে। 
লোকদের কাছে থেকে এত ভৎসনা, ধিক্কার পেয়েও নূহ আ. থেমে যাননি। তিনি এক জনের পর একজনের নিকট দাওয়াত দিতেই থাকলেন এই আশায় যে হয়ত পরবর্তীজন আমার দাওয়াতে সাড়া দিবে। একাধারে ৯০০ বছরেরও অধিক সময় স্বীও কওমকে দাওয়াত দিয়েছিলেন নূহ আ.। তারা নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতকে তাচ্ছিল্য ভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। 
একবার গোত্রের লোকেরা তাঁকে বললেন তুমি যদি দাওয়াত দেয়া থেকে বিরত না হও তবে পাথর মেরে তোমার মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করে দিব। তারপরও তিনি দাওয়াত দিতে থাকেন আল্লাহর কাছে তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর সম্প্রদায়ের অনীহা, অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য এবং ঔদ্ধত্য ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের অহংকার ও অত্যাচার চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল এবং পাপ ষোলকলায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৭০-৮২ জন লোক আল্লাহ পাকের উপর ঈমান এনেছিলেন।
একপর্যায়ে আল্লাহ পাক নূহকে জানিয়ে দিলেন ইতিমধ্যে যারা ইমান এনেছে তারা ব্যতিত আর কেউ তোমার উপরে ইমান আনবে না। আর তিনি যখন এই সংবাদ জানলেন তখন স্বীয় রবের নিকট প্রার্থনা করলেন  ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সাহায্য করুন। কেননা ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছে। আপনি এই কওমের লোকদের উপর চূড়ান্ত ফয়সালা করুন এবং মুমিনদের রক্ষা করুন। তারপর নূহ আ. এ জাতির জন্য চূড়ান্তভাবে বদদোয়া করলেন।
আল্লাহ পাক তার দোয়া কবুল করেন। এবং দিন তারিখের নমুনাও বলে দেন। যেদিন দেখবে চুল্লির মধ্য থেকে পানি উঠিতেছে তখন প্লাবন শুরু হবে। তবে প্লাবনের আগেই একটি নৌকা বা কিস্তি বানিয়ে রাখতে বলেছিলেন। যাতে করে নূহ আ. এবং ইমানদার উম্মতেরা এই প্লাবন থেকে রক্ষা পায়।


আল্লাহ পাকের নির্দেশ মোতাবেক নুহু আ: কিস্তি বা নৌকা নির্মান শুরু করে দিলেন এবং প্লাবনের কথা কওমের নিকট জানিয়ে দিলেন। কওমের লোকেরা আরো তিরস্কার বৃদ্ধি করে দিল। এবং বললো যে, কোথায়ও পানি নেই । এই মরুভূমিতে কিভাবে প্লাবন হবে?
 নূহ আ. তাঁর কিস্তি নির্মাণের কাজ শেষ  করলেন।কিস্তিটি ৩০০ গজ লম্বা ৫০ গজ প্রস্থ ৩০ গজ উচু ও ত্রিতল বিশিষ্ট্য। উহার দুই পার্শ্বে অনেকগুলি জানালা ছিল।নীচ তলায় জীব জন্তু, দ্বিতীয় তলায় পূরুষগণ এবং উপরের তলায় নারীরা আরোহন করেছিল। নির্মাণ কাজ শেষে কাফের সম্প্রদায় দলে দলে এসে এই কিস্তিতে পায়খানা করে পূর্ণ করে ফেলল। নুহু আ: এই দৃশ্য দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। আল্লাহ পাক তাঁকে সাহস দিলেন যে আপনি কোন চিন্তা করবেন না।
 ঐ কিস্তিতে সর্বশেষ যে পায়খানা করার জন্য গেল সে ছিল কুষ্ট রোগগ্রস্থ এক বুড়ি। বুড়ি ঐ কিস্তির মধ্যে পায়খানা করতে গিয়ে ঐ পায়খানা মধ্যে পড়ে বুড়ি ডুবে গেল। পায়খানার মধ্যে গোসল করে বুড়ি উপরে উঠে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে তার দেহে কোন কুষ্ট রোগতো নেই বরং সে ১৬ বৎসরের যুবতির ন্যায় তার চেহারা ফিরে পেল।


লোকেরা এই ঘটনা শুনে দলে দলে এসে কিস্তি থেকে পায়খানা নিয়ে গেল। যারা এসে পায়নি তারা কিস্তি ধুয়ে সেই পানি নিয়ে গেল। কিস্তির সমস্ত পায়খানা এমনভাবে পরিস্কার করলো যে কিছুই বাকী রহিল না। এবার হঠাৎ করে নির্ধারিত দিনে চুল্লির ভেতর থেকে পানি উঠা শুরু করল। নূহ আ. বুঝলেন যে মহাপ্লাবন আসছে। তিনি প্রতিটি প্রাণি থেকে এক জোড়া করে এবং যারা ইমান এনেছে তাদের কিস্তিতে উঠালেন। এদিকে নূহ আ. এর পূতে কেনান কিস্তিতে উঠতে চাইলো। কিন্তু সে ইমান আনেনি। আল্লাহ পাক নূহকে সতর্ক করে বললেন যদি তাকে কিস্তিতে তোলা হয় তাহলে নবুওয়াতি খাতা থেকে তার নাম কর্তন করা হবে। ৪০ দিন টানা প্লাবন ছিল৷ 
প্লাবন শেষে কিস্তি এসে মাটিতে ঠেকল। ১০ রযব মাসের শুরু হওয়া এই মহা প্লাবনের সমাপ্তি ঘটে, ইরাকের মুছেল নগরীর উত্তরে ‘‘ইবনে ওমর” দ্বীপের অদূরে আর্মেনিয়া সীমান্তে অবস্থিত যুদি পবর্ত মালায়, ১০ মহাররাম তারিখে জাহাজটি মাটি স্পর্শ করার মাধ্যমে।
প্লাবনের পর তার সঙ্গে নৌকারোহী মুমিন নর-নারীদের মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুনভাবে আবাদ শুরু হয় এবং তাদেরকে তিনি সত্যের পথে পরিচালিত করেন। এ কারণে তাকে ‘মানব জাতির দ্বিতীয় পিতা বলা হয়।

লেখক- মোহাম্মদ আজাদ হোসাইন ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button