ইতিহাস

শতবর্ষ ব্যাপী যুদ্ধের ইতিহাস ! ইংল্যান্ড বনাম ফ্রান্সের ১০০ বছরের যুদ্ধ

সূচনাঃ

শতবর্ষ ব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয় ১৩৩৭ সালে। ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড অবৈধ ভাবে ফ্রান্সের সিংহাসন দাবি করলে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এটি ছিল ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘকালীন যুদ্ধ। যুদ্ধ এ ফ্রান্সের রাজা প্রথমে পরাজিত হয়ে পলায়ন করলেও পরবর্তীতে ফরাসি বীর কন্যা জোয়ান অফ আর্ক এর বীরত্বের মাধ্যমে ইংল্যান্ডেকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। এযুদ্ধ সমাপ্ত হয় ১৪৫৩ সালে। তবে নামে Hundred Years’ War হলেও এর সময়কাল বরাবর ১০০ বছরের নয়, ১১৬ বছরের। আবার, মাঝে একবার ৯ বছর (১৩৬০-১৯৬৯), আরেকবার প্রায় ২৬ বছর (১৩৮৯-১৪১৫) যুদ্ধবিরতি ছিলো। তাই সবকিছু মিলিয়েই ইতিহাসে এ যুদ্ধ শতবর্ষ ব্যাপী যুদ্ধ হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়ে আসছে।

সূত্রপাতঃ

ঝামেলার শুরুটা হচ্ছে তৎকালীন ইউরোপের নাজুক অবস্থাকে ঘিরে। কে সাম্রাজ্যের অধিকার পাবে, সিংহাসন কে দখল করবে, সেই নিয়ে নিজেদের দেশেই বাজে অবস্থা সবখানে। অনেকটা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত টিভি শো Game of Thrones এর মত অবস্থা।

ফ্রান্সের রাজা দশম লুই-এর কোনো জীবিত পুত্র সন্তান ছিলো না। মেয়েরা সিংহাসনে বসতে পারবে না, এই অজুহাত দিয়ে আর কূটনীতি করে দশম লুই-এর ভাই ফিলিপ সিংহাসনে বসে গেলো। কিন্তু তারই বানানো আইনের কারণে তার মেয়েরাও সিংহাসনে বসতে পারলো না। সাম্রাজ্য চলে গেলো ছোটো ভাই চতুর্থ চার্লসের কাছে। এখান থেকেই আসল ঘটনার শুরু। মজার ঘটনা হচ্ছে তারও পুত্র সন্তান ছিলো না। সে মারা যাওয়ার সময়, তার একটি কন্যা সন্তান ছিলো, আর তার স্ত্রীর গর্ভে ছিলো আরেকটি সন্তান। সময়টা মধ্যযুগ, তাই সন্তান জন্মের আগেই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ সম্ভব ছিলো না। মারা যাওয়ার আগে চতুর্থ চার্লস এই শর্ত দিয়ে গেলো যে, সন্তান জন্ম নেয়ার পর যদি দেখা যায় পুত্র হয়েছে, তাহলে সেই পুত্রই বড় হয়ে সিংহাসন পাবে। আর নইলে সিদ্ধান্তটা সভাসদদের হাতেই চলে যাবে। কিন্ত ভাগ্যের ইশারায় জন্ম নিলো এক কন্যা সন্তান। তাই সিদ্ধান্ত চলে গেল সভাসদদের হাতে।

এবার ঘটনার মোড় ঘোরানো পর্ব। চতুর্থ চার্লসের আপন বোন ইসাবেলার বিয়ে হয় ইংল্যান্ডের রাজা  এডওয়ার্ড দ্বিতীয় এর সাথে। তাদের সন্তান এডওয়ার্ড তৃতীয়। সেই হিসেবে এখন ফ্রান্সের সিংহাসনের দাবীদার ইসাবেলার সন্তান ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড তৃতীয়। তবে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন ফরাসীরা কোনও বিদেশী রাজার অধীনে যেতে অস্বীকার করে, তাই তখন ফ্রান্সের ফিলিপ ষষ্ঠ নিজ রাজ্যের নাগরিকাদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাজ্যভার গ্রহণে উদ্যোগ নিলে ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড এবং ফ্রান্সের রাজা ফিলিপের মধ্যে মতবিরোধের সূচনা হয়। এই মতবিরোধই পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এডওয়ার্ডিয়ান যুদ্ধ-১ম পর্যায়(১৩৩৭-১৩৬০)

যুদ্ধের শুরুতে ফ্রান্স ইংল্যান্ডের চেয়ে সবদিক বিবেচনায় বেশি শক্তিশালী ছিল। কারণ হিসেবে বলা যায় তৎকালীন ফ্রান্সের আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থসম্পদ সবকিছুই ছিলো ইংল্যান্ডের চাইতে বেশি। এছাড়া ফরাসি নাইট এবং অশ্বারোহী বাহিনী ছিলো সমস্ত  ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত এবং শক্তিশালী। জনসংখ্যার হিসেবে বলতে গেলে ফ্রান্সে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ ছিল এবং ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা মাত্র ৪০ লক্ষ। ফ্রান্স যেহেতু মধ্যযুগে একটি বিকেন্দ্রীকৃত সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র ছিল, তাই ততটা ঐক্যবদ্ধ ছিল না সেসময়ে ফ্রান্স। সেজন্য নিজেদের আরো শক্তিশালী করতে ফ্রান্স স্কটল্যান্ড এবং বোহেমিয়ার সাথে জোট বেঁধেছিল, অপরদিকে ইংল্যান্ডকে নিম্ন দেশগুলির(Low Countries বলা হয়ে থাকে) কিছু অংশ এবং ফ্রান্সেরই কিছু অঞ্চল(ইংল্যান্ডের প্লান্টেজনেট রাজাদের অনুগত) সমর্থন করেছিল। ১৩৪০ সালে স্লুইসের যুদ্ধে ইংরেজরা সমুদ্রের উপরে একটি বিশাল জয়লাভ করে যা তাৎক্ষণিকভাবে ফ্রান্সকে ইংল্যান্ড আক্রমণে বাধা দেয়। তবে এরপরের বেশিরভাগ যুদ্ধই ফ্রান্সের ভূখন্ডে হয়েছিল। ইংলিশরা তখন ১৩৪৬ সালে ক্রিসির যুদ্ধে সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় এক জয় অর্জন করেছিল। ফরাসি অশ্বারোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ইংরেজদের লংবো নামক ধনুকের ব্যবহার – এই জয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

১৩৩৪ থেকে ১৩৫৬ সাল পর্যন্ত ব্ল্যাক ডেথের কারণে খুব সামান্য লড়াই হয়েছিল। এ সময় যুদ্ধ ছাড়াই ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে অনেক লোক মারা গিয়েছিল। ব্ল্যাক ডেথের প্রাদুর্ভাব একটু কমে আসলে  ব্ল্যাক-প্রিন্স খ্যাত রাজা এডওয়ার্ড ইংল্যান্ডের হয়ে পোয়েটিয়ার্সের যুদ্ধে আরও একটি দুর্দান্ত জয় অর্জন করেন। ফ্রান্সের রাজা জন দ্বিতীয় এই যুদ্ধের সময় ধরা পড়েছিলেন। পরবর্তীতে ইংরেজরা আবার ফ্রান্স আক্রমণ করেছিল কিন্তু আর কোনও শহর দখলে নিতে সক্ষম হয় নি। ১৩৬০ সালে একটি চুক্তির ফলে ফ্রান্স তাদের প্রায় এক চতুর্থাংশ ইংল্যান্ডকে দিয়েছিল। শত বছরের যুদ্ধের এই প্রথম অংশটিকে এডওয়ার্ডিয়ান যুদ্ধ বলা হয়।

ক্যারোলিন যুদ্ধ-২য় পর্যায়(১৩৬৯-১৩৮৯)

১৩৬৯ সালে আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ফ্রান্সের নতুন রাজা চার্লস পঞ্চম তার সেরা নাইট বার্ট্রান্ড ডু গেচলিন এর সাহাযে এবার সফল হয়েছিলেন। কূটনীতিক কৌশলরূপে ফ্রান্স ক্যাসটিলের সাথে জোট বেঁধে ইংল্যান্ড এবং পর্তুগালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলো এবার। এই সময়ে ইংরেজদের পূর্বেপ্রদত্ত বেশিরভাগ ভূমি ফ্রান্স ফিরে পেয়েছিল এবং ফ্রান্সের হয়ে কোচেরেল এবং পন্টভালাইনের লড়াইয়ে বার্ট্রান্ড ডু গেচলিন দুর্দান্ত জয় পেয়েছিল। এরপর একটি সাময়িক শান্তিচুক্তি ১৩৮৯ থেকে ১৪১৫ পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছিল। যুদ্ধের এই দ্বিতীয় অংশটিকে ক্যারোলিন যুদ্ধ বলা হয়।

ল্যানকাস্ট্রিয়ান যুদ্ধ-শেষ পর্যায়(১৪১৫-১৪৫৩)

যুদ্ধের সর্বাধিক বিখ্যাত অংশটি ১৪১৫ সালে শুরু হয়েছিল। ইংল্যান্ডের পঞ্চম হেনরি ফ্রান্স আক্রমণ করেছিলেন এবং তার দুর্দান্ত লংবো-ম্যানদের সাহায্যে আবারো অ্যাজিনকোর্টের কুখ্যাত যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে যে এই যুদ্ধে ফরাসি আভিজাত্যের একটি বড় অংশ নিহত হয়েছিল। তৎকালীন ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস ছিলেন একটু পাগলাটে ধাঁচের এবং রাজ্য শাসনে পুরোপুরি অক্ষম। তাছাড়া তাঁর প্রায় সমস্ত পুত্রই মারা গিয়েছিলেন তরুণ বয়সে। এইসব কারণে ফ্রান্সের রানী বাভারিয়ার ইসাবাউ তার এক কন্যাকে হেনরি পঞ্চমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন এবং হেনরি পঞ্চমকে ফ্রান্সের পরবর্তী রাজা হিসাবে পরিণত করার জন্য ট্রয়ের চুক্তিতে সই করেছিলেন। হেনরি পঞ্চম এবং চার্লস ষষ্ঠ উভয়ই ১৪২২ সালে একই সময় মারা গিয়েছিলেন। সুতরাং ইংরেজরা বিশ্বাস করেছিল যে ইংরেজ পুত্র হেনরি ষষ্ঠ(হেনরি পঞ্চমের ছেলে) এখন ফ্রান্সের ন্যায়সঙ্গত রাজা এবং বহু ফরাসী লোক তাতে একমতও হয়েছিল। তবে এক্ষেত্রে আপত্তি জানায় চার্লস ষষ্ঠের শেষ ছেলে চার্লস সপ্তম। সে নিজেকে রাজা ঘোষণা করত্র চায়। তবে খোদ ফ্রান্সের মধ্যেই অনেকে তাকে রাজা মানতে নারাজ ছিলেন। তাদের ধারণামতে তিনি রাজা হওয়ার যোগ্য নন কারণ তিনি ইসাবাউ এর অবৈধ সন্তান ছিলেন।

এসব ডামাডোলে ততদিনে ইংরেজরা ফ্রান্সে জমি দখল করতে থাকে এবং বারগুন্ডির সাথে একটি জোট গঠন করে। তারা ভের্নুইলের যুদ্ধে আরও একটি বড় জয় লাভ করেছিল। কিন্তু ১৪২৯ সালে, ফ্রান্সের বিখ্যাত জোয়ান অফ আর্ক, অরলিন্স অবরোধের সময় ফরাসী সেনাবাহিনীকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যায়। তারপরে একই বছর পাতয়ের যুদ্ধে লা হিরের নেতৃত্বে ফরাসি নাইটরা দুর্দান্ত জয় লাভ করে এবং ফরাসি অশ্বারোহীরা বেশিরভাগ ইংরেজ লংবো-ম্যানকে হত্যা করেছিল। জোয়ান ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বের অনেক শহর আবার ফিরে পেয়েছিল এবং চার্লস সপ্তমকে তাঁর রাজ্যাভিষেকের দিকে নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তিনি প্যারিসকে পুনরুদ্ধার করতে পারেন নি। তিনি ১৪৩০ সালে বারগুন্ডিয়ানদের দ্বারা বন্দী হয়েছিলেন, তাকে ধর্মবিরোধী বলে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং ১৪৩১ সালে তাকে মৃত্যদন্ড দেয়া হয়েছিল। তার মৃত্যুর পরে ফরাসীরা তাদের অঞ্চল টুকরো টুকরো করে নিয়ে যেতে থাকে। তবে পরবর্তীতে ফ্রান্সের কূটনৈতিক জয় ছিল ১৪৩৩ সালে আরারস চুক্তি- যেখানে বারগুন্ডি ইংল্যান্ডের মিত্র হওয়া বন্ধ করে দিয়ে ফ্রান্সের সাথে শান্তি স্থাপন করেছিল। ১৪৫০ সালে, ফর্মিগনি যুদ্ধে ফ্রান্স আরেকটি দুর্দান্ত জয় লাভ করে এবং নরম্যান্ডিকে পুনরায় দখল করে। সর্বশেষে ক্যাসটিলনের যুদ্ধে ফরাসিদের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের এই তৃতীয় এবং শেষ অংশটিকে ল্যানকাস্ট্রিয়ান যুদ্ধ বলা হয়।

লেখক- সাঈদ সিদ্দিকী মৃদুল ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button