প্রযুক্তিজানা-অজানা

যে ১০ জায়গার মানুষ আধুনিক পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে !

দ্রুত নগরায়নের জগতে, আমরা প্রায়ই ধরে নিই যে পৃথিবীতে বাহ্যিক যোগাযোগ ছাড়া কোন উপজাতি এখন আর বিচ্ছিন্ন থাকেনা। কিন্তু এই পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু জনগোষ্ঠী আছে যারা তাদের যাযাবর জীবন পদ্ধতি বজায় রেখেছে। তারা সকল প্রকার বাহ্যিক যোগাযোগ ছাড়াই তাদের জীবন যাপন করছে। চলুন জেনে আসি এমন ১০ টি যাযাবর সম্প্রদায়ের নাম ও তাদের জীবনধারা নিয়ে নানা তথ্যঃ


১। ‘মাশকো-পিরো’ পেরুর আনুমানিক পনেরটি আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম। তারা তাদের বাইরের কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছাড়াই বাস করে। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ‘রাবার বুম’ এর আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাবশালীরা আমাজনে রাবার চাষ করতো। তারা স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতি ভয়াবহ আচরণ করতো। তারা তাদের জমি আক্রমণ করে এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে, তাদের মধ্যে ‘ম্যাশকোস’ ছিল অন্যতম একটি গোষ্ঠী। তাদের যারা বেঁচে ছিল তারা রেইনফরেস্টের গভীরে ফিরে গেছে এবং তারপর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে তারা সেখানে বাস করছে। আজ ‘মাশকো-পিরো’ একটি যাযাবর জাতি এবং তারা শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে, কিন্তু ‘রাবার বুম’ তাদের আঘাত করার আগ পর্যন্ত তারা সমাজবদ্ধ জীবনে বসবাস করতো এবং কৃষিকাজ করতো। খ্রিস্টান মিশনারিরা ‘মাশকো-পিরো’ অঞ্চলে এখন প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে, তারা আশা করছে যে তারা মাশকোসদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করবে এবং তাদের খ্রিস্টান ধর্মে রূপান্তরিত করবে।

আর্টিকেল পড়তে ভাল লাগছে না ভিডিও দেখুন


২। পামারস্টন দ্বীপ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের কুক দ্বীপপুঞ্জের অংশ। এই দ্বীপ একটি প্রবাল এটোল উপর অবস্থিত ছয়টি প্রধান দ্বীপের একটি এবং একমাত্র যা অধ্যুষিত হয়। পামারস্টন দ্বীপ পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন স্থানগুলির একটি, এবং এর প্রায় সকল অধিবাসী আজ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। তারা ইংরেজদের বংশধর এবং তারা প্রায় ১৫০ বছর আগে এখানে বসতি স্থাপন করেছে। জেমস কুক তার দ্বিতীয় যাত্রার সময় ১৯৭৭ সালে পামারস্টন দ্বীপ প্রথম আবিষ্কার করেন। সে সময়, দ্বীপটি জনবসতিহীন ছিল, যদিও প্রমাণ আছে যে এটি একসময় পলিনেশীয়দের দ্বারা জনশূন্য করা হয়েছিল। ১৮৬৩ সালের জুলাই উইলিয়াম মার্স্টার্স নামে একজন ইংরেজ পামারস্টনে আসেন। তিনি দ্বীপটির সৌন্দর্য দ্বারা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন। যখন মার্স্টার্স দ্বীপে পা রাখলেন তখন তিনি তাঁর তিন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন কুক দ্বীপপুঞ্জের প্রধানের কন্যা আকাকিঙ্গারো (সারাহ নামে পরিচিত), আর বাকি দুজন ছিল তার চাচাতো বোন। আজ, পামারস্টন দ্বীপে তিনটি পরিবার বাস করছে, প্রতিটি মার্স্টারের তিন স্ত্রীর একটি থেকে এসেছে।


৩। ত্রিস্তান দা কুনহা দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দূরবর্তী গোষ্ঠীর নাম। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী অধ্যুষিত দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন উপকূল থেকে প্রায় ১,৫১১ মাইল দূরে, সেন্ট হেলেনা থেকে ১,৩৪৩ মাইল এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উপকূল থেকে ২,১৬৬ মাইল দূরে অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৯৮ বর্গ কিলোমিটার। এটি গফ দ্বীপ, একটি দুর্গম দ্বীপ এবং ছোট, বাস অযোগ্য নাইটিংগেল দ্বীপ নিয়ে গঠিত। ২০১৮ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী প্রধান দ্বীপটি্তে ২৫০ জন স্থায়ী বাসিন্দা আছে, যারা সবাই ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি নাগরিকত্ব বহন করে। এর অন্যান্য দ্বীপ জনবসতিহীন। শুধু গফ দ্বীপের একটি আবহাওয়া স্টেশনে কিছু দক্ষিণ আফ্রিকান কর্মীদের দেখা পাওয়া যায়। ত্রিস্তান দা কুনহা একটি ব্রিটিশ বিদেশী অঞ্চল যার নিজস্ব সংবিধান রয়েছে। প্রধান দ্বীপটিতে কোন ধরনের এয়ারস্ট্রিপ নেই। ত্রিস্তানে যেতে হলে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নৌকায় করে ছয়দিন ভ্রমণ করতে হয়।


৪। কুবার পেডি স্টুয়ার্ট হাইওয়েতে অ্যাডিলেড থেকে ৮৪৬ কিলোমিটার উত্তরে উত্তর-দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার একটি শহর। ২০১৬ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট অনুযায়ী, কুবার পেডিতে জনসংখ্যা ছিল ১,৭৬২ জন। এর মধ্যে ৯৬২ জন পুরুষ এবং ৮০১ জন মহিলা। এই শহরকে কখনও কখনও বিশ্বের ওপালের রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কারণ সেখানে কিছু মূল্যবান ওপাল আছে। কুবার পেডি তার আন্ডারগ্রাউন্ড বাসস্থানের জন্য বিখ্যাত, যাকে বলা হয় “ডাগআউট”। দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরমের কারণে কুবার পেডিতে এই পদ্ধতিতে ঘর-বাড়ি নির্মিত হয়। “কুবার পেডি” নামটি এসেছে স্থানীয় আদিবাসী শব্দ কুপা-পিটি থেকে, যার মানে “পানির গর্ত”। ১৯১৫ সালে কুবার পেডিতে প্রথম অপাল পাওয়া যায়; তারপর থেকে এই শহরের বুক থেকে বিশ্বমানের মূল্যবান রত্ন, ওপাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখানে ৭০টি ওপাল খনি আছে। কুবার পেডি একটি খুব ছোট শহর। এটি একটি জনপ্রিয় স্টপওভার পয়েন্ট এবং এটি এখন একটি পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠেছে।


৫। লিবিয়ার সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে সিওয়া মরুভূমি অবস্থিত।, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫ মিটার নিচে অবস্থিত এই উর্বর অববাহিকায় আছে সারি সারি জলপাই গাছ যা ধীর গতির সমুদ্র জীবনের প্রতীক। এটি মরুভূমির এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য। সিওয়া, মিশরের সব রহস্যের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সিওয়ান জনগণের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং রীতিনীতি আছে। তারা আরবী ভাষায় কথা বলে। নারীরা এখনো ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং সিলভার জুয়েলারি পরে এবং সিওয়া ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় হস্তশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। আধুনিক সিওয়া শহরে ঘন খেজুর বাগান, দেয়াল ঘেরা বাগান এবং জলপাই বাগান, অসংখ্য তাজা পানির ঝরনা এবং লবণাক্ত হ্রদ আছে। সিওয়ার মানুষ বাইরের জগতের সাথে একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করে। সিওয়ার ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা একটি অনন্য সমাজকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে যা মূলধারার মিশরীয় সংস্কৃতি থেকে আলাদা।


৬। চাংপা একটি আধা-যাযাবর তিব্বতী জাতি। এরা প্রধানত লাদাখের চাংতাং এবং জম্মু কাশ্মীরে বসবাস করে। এদের একটি ছোট সংখ্যা তিব্বতের পশ্চিমে স্বায়ত্তশাসিত একটি অঞ্চল, চ্যাংটাং-এ বসবাস করে। ১৯৮৯ সালে চ্যাংটাং এলাকায় অর্ধ মিলিয়ন যাযাবর বাস করত। চাংপারা প্রধানত ইয়াক এবং ছাগল লালন-পালন করে। চাংপারা তিব্বতী ভাষার একটি উপভাষা চ্যাংসখাতে কথা বলে এবং তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের চর্চা করে। চ্যাংপাস অত্যন্ত পেডিগ্রিড এবং মূল্যবান চ্যাংরা ছাগল (কাপ্রা হিরকাস) লালন করে, যা বিরল পশমিনা ফাইবার (ক্যাশমেয়ার পশম) উৎপাদন করে। ক্যাশমেয়ার ছাগল (চ্যাংরা ছাগল) তাদের মাংসের জন্য নয় বরং তাদের পশমের জন্য লালন করা হয়। লাদাখে চাংপাদের মধ্যে, যারা এখনো যাযাবর তারা ফালপা নামে পরিচিত, এবং তারা হ্যানলি উপত্যকা থেকে লাতো গ্রামে বসবাস করে।


৭। আওয়া পূর্ব আমাজনের রেইনফরেস্টে বসবাসকারী ব্রাজিলের একটি আদিবাসী। সেখানে প্রায় ৩৫০ জন মানুষ আছে, এবং তাদের কমপক্ষে ১০০ জনের সাথে বহির্বিশ্বের কোন যোগাযোগ নেই। তারা গুয়াজা ভাষায় কথা বলে। মূলত তারা ইউরোপীয়দের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ১৮০০ সালে যাযাবর জীবনধারা গ্রহণ করে। ১৯ শতকে, তারা এই অঞ্চলের বসতিস্থাপনকারীদের দ্বারা ক্রমবর্ধমান আক্রমণের সম্মুখীন হয়, যারা তাদের ভূমি থেকে উৎখাত করা হয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কিছু আওয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত বসতিতে স্থানান্তরিত হয়। যাইহোক, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে, তারা সম্পূর্ণভাবে তাদের ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তারা কয়েক ডজন লোকের যাযাবর দলে ভাগ হয়ে জীবন-যাপন করে। তাদের সাথে বহির্বিশ্বের সামান্য কোন যোগাযোগ নেই।


৮। আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া হ্রদের মিগিঙ্গো দ্বীপ একটি মাছ ধরার কেন্দ্র। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে একটি লাভজনক রপ্তানিমুখী দ্বীপ। এটি ০.৪৯ একর আয়তনের একটি পাথরে দ্বীপ যা ওভারল্যাপিং হাউস দ্বারা আবৃত। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে কেনিয়া এবং উগান্ডার মধ্যে দীর্ঘদিনের বতর্ক বিদ্যমান। দ্যা ন্যাশনাল রিপোর্ট অনুযায়ী এই দ্বীপে ৫০০ জনের বাস। দুই কেনিয়ান জেলে, ডালমাস টেম্বো এবং জর্জ কিবেব, দাবি করেন যে তারা দ্বীপের প্রথম বাসিন্দা। ১৯৯১ সালে যখন তারা সেখানে বসতি স্থাপন করে, তখন এটি আগাছায় ঢাকা ছিল এবং সেখানে অনেক পাখি ও সাপ বাস করত। উগান্ডার মৎস্যজীবী জোসেফ নসুবুগা বলেছেন যে তিনি ২০০৪ সালে মিগিঙ্গোতে বসতি স্থাপন করেন, যখন তিনি দ্বীপে যা খুঁজে পান তা ছিল একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। পরবর্তীতে কেনিয়া, উগান্ডা এবং তানজানিয়া থেকে আসা অন্যান্য জেলেরা মাছ ধরার সমৃদ্ধ উৎসের জন্য এই দ্বীপে আসেন।


৯। ভিলা লাস এস্ট্রেলাস বা ইংরেজিতে “দ্যা স্টারস টাউন” এন্টার্টিকের মাঝখানে একটি ছোট শহর। এটি ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ, চিলির এই শহর একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। ভিলা লাস এস্ট্রেলাসে গ্রীষ্মকালে ১৫ জন এবং শীতকালে ৮০ জন বাসিন্দা রয়েছে। কেউ স্থায়ীভাবে সেখানে থাকেনা, মানুষ সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে দ্বীপ ছেড়ে চলে যায়। তাদের অধিকাংশই বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা। এখানে প্রায় পনেরজন শিশু আছে যারা “ভিলা লাস এস্ট্রেলাস” স্কুলে পড়াশোনা করে। এটি একটি ১ম-৮ম শ্রেণীর প্রাথমিক বিদ্যালয় যেখানে শিশুদের শিক্ষার জন্য মাত্র দুইজন শিক্ষক নিয়োজিত আছে। এছাড়াও একটি পৃথক কিন্ডারগার্টেন আছে যেখানে মাত্র ছয় জন ছাত্র এবং একজন প্রশিক্ষক আছে। এছাড়াও একটি গ্রন্থাগার আছে যেখানে কিছু বইয়ের সংগ্রহ আছে। সেখানে শুধুমাত্র একজন ডাক্তার, একজন নার্স এবং দুটি হাসপাতাল শয্যা আছে। এখানে ২০ জন অতিথির জন্য একটি হোটেল, শহরের মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্মারক দোকান, এবং একটি জিমন্যাসিয়াম আছে, যেখানে তারা ব্যায়াম করার পাশাপাশি পিং পং, বেবিফুটবোল, অথবা সাউনা উপভোগ করতে পারে।


১০। সেন্টিনেলিজ আদিবাসীরা উত্তর সেন্টিনেলের ক্ষুদ্র দ্বীপে বাস করে যা বঙ্গোপসাগরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের অংশ। তারা বহিরাগতদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে এবং যখন কেউ যোগাযোগ স্থাপন করতে চায় তখন তারা হিংস্রভাবে তার প্রতিবাদ করে। সেন্টিনেলিরা প্রায় ৬০,০০০ বছর ধরে দ্বীপে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছে। কিন্তু বহিরাগতদের প্রতি তাদের প্রতিকূল মনোভাব সম্ভবত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে। তাদের সংখ্যা এখন ১০০ জনেরও কম। তাদের প্রধান খাদ্য মাছ ও নারিকেল।

এরকম আরো আর্টিকেল পড়ুন –

১। লাস ভেগাস : ইতিহাসের পাতায় নাম যার পাপের নগরী !

২।নিলামে বউ বিক্রি হয় যে সব বাজারে !

আফিয়া জাহান ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর- AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button