জীবনীসাম্প্রতিক

কে এই ডা. ফেরদৌস ? আসলেই কি তিনি খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা/ কর্ণেল রশিদের খালাতো ভাই?

নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফেরদৌস খন্দকার। গত মার্চ মাসে নিউ ইয়র্কে করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করলে অনেক চিকিৎসক চেম্বার বন্ধ রাখেন। কিন্তু সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন ডা. ফেরদৌস। দুঃসময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ডা. ফেরদৌস। চেম্বার খোলা রেখে করোনা আক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন। মনস্থির করলেন নিজের মাতৃভূমিতে এসে নিজেকে বিলিয়ে দিবেন দেশের মানুষের স্বার্থে। গেল কিছু দিন আগে সে উদ্দেশ্যেই দেশে এসেছেন এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। চলুন তার শৈশবসহ তার সম্বন্ধে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।


নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ডা. ফেরদৌস খন্দকার। জন্মগ্রহণ করেছেন কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বারে। বাবা ফয়েজ আহমেদ খন্দকার বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। অল্প বয়সেই বাবা হারান ডাক্তার ফেরদৌস। মা আনোয়ারা বেগম খন্দকার পেশায় একজন গৃহিনী। তিন ভাইবোনের মধ্যে ডা. ফেরদৌস সবার বড়। দুইবোনের মধ্যে একজন ফারাহ জেবা খন্দকার, ফ্লোরিডা প্রবাসী ফার্মাসিস্ট। ডা. ফেরদৌসের অপর বোন চাঁদনী একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। 
ডাক্তার ফেরদৌসের মায়ের পরিবার দেবিদ্বারের পাশের মুরাদনগরের কেষ্টপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার নানা সামরিক বাহিনীতে অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন। সহজ-সরল মানুষ। উনার ছয় ছেলে, এক মেয়ে। তার প্রথম ছেলে খুরশিদ আনোয়ার সাহেব, উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ওই সময় সেই এলাকার মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার ছিলেন তিনি। পরে ফার্মাসিস্ট হয়ে বিদেশে চলে গিয়েছেন। আমেরিকায় সেটেল। দ্বিতীয় জনও মুক্তিযোদ্ধা, অ্যাকাউন্টেন্ট। বেশ নামকরা মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকার বনানীতে থেকেন তিনি। এরপর বাকি যে চার মামা সবাই আমেরিকাতে থাকে।


ছোটবেলা থেকেই স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতে পছন্দ করতেন ডাক্তার ফেরদৌস। গ্রামে এবং নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানা স্বেচ্ছাসেবী কাজের সাথে জড়িত ছিলেন এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।  তিনি ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ইন্টার্নিশিপসহ মেডিসিনে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তারপর পরিবার সহ পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার নিউইয়র্ক মেডিকেল কলেজ থেকে প্রশিক্ষণসহ চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ধীরে ধীরে বাংলাদেশিদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ডাক্তার ফেরদৌস। পাশাপাশি জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। ডাক্তার ফেরদৌস কোন কাজকেই ছোট মনে করেন নি। একসময় আমেরিকায় ট্যাক্সি ক্যাব চালিয়েছেন।   এমনও অনেক দিন গেছে টানা ১৯ ঘন্টা তিনি ট্যাক্সি চালিয়েছেন।  দশজন সাধারণ অভিবাসীর মতই তিনি ঘুরেছিলেন এই শহরে ভাগ্যের অন্বষনে। যুক্তরাষ্ট্রে ডাক্তারী পেশার জন্য প্রাকটিস সনদ পরিক্ষার খরচ যুগিয়েছিলেন এবং শেষ দিকে এসে যখন এই ডাক্তারী অফিসটি ভাড়া নিয়েছিলেন, সেটার ভাড়া আর কর্মচারীদের বেতন তুলে চলতেন।


লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নিজের পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে বেছে নিয়েছেন ডাক্তার ফেরদৌস। নিজের পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ডাক্তার ফেরদৌস হয়ে উঠলেন সফলদের একজন। 
তিনি জ্যাকসন হাইটসের ব্যস্ততম ৩৭ স্ট্রিটে ওয়েস্টার্ন কেয়ার মেডিকেল কেয়ার পিসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সমমনাদের নিয়ে। সেখানে দেশি বিদেশি ৭ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বসেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের মূর্তমান বিশ্বস্ততার প্রতিক হয়ে উঠলেন ডাক্তার ফেরদৌস। একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশী, ভারতীয় এবং পাকিস্থানী নাগরিকদের মধ্যে যথেষ্ট খ্যাতি কুড়িয়েছেন তিনি। নিউইয়র্কের অলাভজনক সংস্থা দি অপটিমিস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তিনি। সেই সংস্থার পক্ষ থেকে অ্যাল্মহার্স্ট এবং জ্যামাইকা হাসপাতালে মাস্ক, গ্লাভসসহ প্রয়োজনীয় নানা চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছেন। করোনাকালে বিনা মূল্যে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও খাদ্য বিতরণের কাজ করছেন নিয়মিত।রোগিদের আস্থা আর তাদের প্রতি সেবাকে আরো বিস্তৃত করতে নতুন একটি মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন ফেরদৌস খন্দকার। জ্যাকসান হাইটস এর ৭০-৩৮ ব্রডওয়েতে এই চিকিৎসা কেন্দ্রটি অবস্থিত। মানুষজন বিক্ষিপ্তভাবে এদিক সেদিক না গিয়ে যাতে এক ছাদের নিছে সেবা পায় সেজন্যই তার এই প্রচেষ্টা। 


ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখার পাশাপাশি, ফেসবুক এবং ইউটিউবে নিয়মিত স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করাই তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি চান মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞানের পরিধি বিস্তার হোক।
বিদেশে থাকলেও স্বদেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করলেন। মেডিকেলের শিক্ষার্থী হিসেবে সেনাবাহিনীর বৃত্তি পেয়েছিলেন। অর্থ-বিত্তে সাফল্যে পৌঁছার শুরুতেই তিনি সেই বৃত্তি ফেরত দিয়েছেন। নানাভাবে তাঁর দায় পরিশোধের উদ্যোগের কথা জানালেন। নিজের অর্থ ব্যয়ে গ্রামে হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রম করছেন। এসব কাজ করতে গিয়ে নানা বাধাবিপত্তির মোকাবিলা করেছেন।
জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে বছরে অন্তত চারবার দেশে আসেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার। নিজের এলাকার জন্য, স্বদেশের মানুষের জন্য কিছু করার তাড়না থেকেই আসেন তিনি। অর্থনৈতিকভাবে বেশ সফল হলেও ভ্রমণের সময় বাড়তি ব্যয় করেন না। বেঁচে যাওয়া সেই অর্থ বরং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন।
করোনাভাইরাসের এই ক্রান্তিলগ্নে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে দেশে ছুটে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী ডা. ফেরদৌস খন্দকার। দেশে এসে পড়েছেন বিপত্তির মুখে। অনেকে আবার তাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার কুশীলব খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা ও বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশিদের খালাতো ভাই হিসেবে প্রচার করছেন।


আসলেই কি তিনি খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা বা কর্ণেল রশিদের খালাতো ভাই??
ডা. ফেরদৌস খন্দকারকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা অপপ্রচার চলছে। ফেসবুকে কেউ কেউ তাকে বঙ্গবন্ধুর খুনির আত্মীয় বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়  তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আত্মীয় না, তার কোন আত্মীয় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আত্মীয়ও না। 
তিনি বলেন, আমার বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারে। কুমিল্লায় বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের বাড়ি। কুমিল্লা বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য জেলা। কুমিল্লায় বাড়ি হলেই কেউ খুনি মোশতাকের ভাতিজা কিংবা কর্নেল রশিদের খালাতো ভাই হয়ে যায় না।দুই খুনির সাথে আমার পারিবারিক কিংবা আদর্শিক কোন সম্পর্ক নেই। বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে আমি তাদেরকে চরম ঘৃণা করি। ফলে যারা এই খারাপ কথাগুলো ছড়াচ্ছেন, বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য পরিস্কার; ভালো কাজে বাধা দেয়া। এটা অন্যায়।
তিনি আরো বলেন আমি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আত্মীয় না, আমার কোন আত্মীয় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আত্মীয় না। আমি এমপি বা মিনিস্টার হতে আসিনি, আমি চেয়েছি বাংলাদেশের মানুষকে সেবা করতে। আমার শিক্ষা এবং মেধা মানুষের কাজে লাগাতে। সেটা যদি অপরাধ হয় আমাকে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘যাই হোক, আমি আজীবন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগ করেছি অ্যাকটিভলি এবং তার আদর্শও ধারণ করেছি। তার মানে এই নয়, অন্য মতের মানুষগুলোকে আমি গালাগালি করছি। 


আমি তাদের বিরুদ্ধাচারণ করেছি, তাদের মতের সঙ্গে আমার মিল ছিল না, যুক্তি-তর্কে যা করার তাই করেছি। তার মানে এই নয়, আমি হেরে গেছি, তাদের মতের সঙ্গে মিলে গেছি। এটা আমি স্পষ্ট বলতে চাই এবং করেও যাব। এটিই তো কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। আমি সেই নীতিতে বিশ্বাস করি।’
দেশসেবা করতে এসেছেন জানিয়ে ডা. ফেরদৌস বলেন, ‘দেখুন আমি দেশে এসেছি সেবা দিতে। আমি শুধু মুখে বলেই ক্ষান্ত হইনি। আমি পরিবারকে পেছনে ফেলে ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছি। আমি কিন্তু জানিও না, কবে প্লেন খুলবে, আমি আমার পরিবারের কাছে যেতে পারব। আমি কিন্তু আপনাদের দেশে, আপনাদের টানে এসেছি। আমি হেরে যাওয়ার জন্য আসিনি।’
ডা. ফেরদৌস বলেন, ‘এই বিরুদ্ধাচারণ হচ্ছে, আমি এই ভূ-খণ্ডে থেকে ফাইট করব। আপনাদের পাশে দাঁড়াব। আমৃত্যু আমি আপনাদের সাথে আছি। আশা করছি, আপনারাও আমাকে গ্রহণ করবেন সেভাবে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button