ইতিহাস

সিল্ক রোড : প্রাচীন ইতিহাসের দীর্ঘতম ও রোমাঞ্চকর বানিজ্য পথ!

“সিল্ক রোড” নামটি শুনতেই নিঃসন্দেহে যে কারো মগজে চিন্তা খেলে উঠবে ,  এই পথের সাথে সিল্ক বা রেশমের কোনো একটি বিশেষ সম্পর্ক আছে। তবে যদি আপনি ও  বিষয়টি ভেবে থাকেন আপনি মোটেও ভুল নন। “সিল্ক রোড” প্রাচীন পৃথিবীর দীর্ঘতম ও ঐতিহাসিক  বানিজ্য পথের একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে বিখ্যাত। যা চীনের সাম্রাজ্যের শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর পূর্ব–পশ্চিমাংশের সংযোগ এই ঐতিহাসিক  সিল্ক রোড। 

চীনের সাথে ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল গুলোর বানিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় মিথস্ক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে সিল্ক রোড। জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ১৩০ অব্দ থেকে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পশ্চাতের  ইউরোপ ও প্রাচ্যের চীন এ দুইয়ের মধ্যে বেশ জমজমাট বাণিজ্যের নির্ভরযোগ্য পথ ছিল সিল্ক রোড। উল্লেখযোগ্য যে, ইউনেস্কো পৃথিবীর এই প্রাচীনতম বানিজ্য  পথটিকে  “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” এর অন্তর্ভূক্ত করেছে। 

প্রাচীন চীন যেমন তাদের চৌকষ জ্ঞান ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বানিজ্য শুরু করেছিল আজকের দিনের চীন ও তার ব্যতিক্রম নয় । ২০১৩ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং এই পথটি পুনঃ নির্মানের প্রস্তাব দেন যা সফলকরণে চীন সরকার এখনও কাজ করে যাচ্ছে। কেনো এই সিল্ক রোড কে রোমাঞ্চকর ও ভয়নাক পথ বলা হতো  নিশ্চয়ই এখন এমন অনেক অজানা  প্রশ্ন মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তাহলে আসুন সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে কল্পনার মধ্য দিয়ে ঘুরে আসা যাক সেই ঐতিহাসিক প্রাচীন সিল্ক যুগ  থেকে।

সিল্ক রোড ও এর নামকরণ 

“সিল্ক রোড” নামটি কোনো একক পথ নির্দেশ করলেও এটি বাস্তবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার স্থলভিত্তিক অনেকগুলো বানিজ্য পথের যোগসূত্র। যা চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্য প্রাচ্য, আফ্রিকার কিছু দেশ ও ইউরোপকে এক সু‌‌তোর গাঠে বেঁধেছে।  সিল্ক রোড প্রাচীন পথ হলে এর নামটি খুব বেশি পুরাতন নয়। ইতিহাসকে লক্ষ্য করে, সিল্ক বা রেশমকে কেন্দ্র করেই এই পথে বাণিজ্য গড়ে উঠায়, ১৮৭৭ সালে এক জার্মানি ভূতত্ত্ববিধ ফার্ডিন্যান্ড ভন রিথোফেন এই পথের নামকরণ করেন “সিল্ক রোড”।  

১৩০ খ্রিস্টপূর্বের মূলত সিল্ক বা রেশমকে কেন্দ্র করেই চীনের হান বংশের সাথে পশ্চিমের বানিজ্য শুরু হয় ।  আর তখনই এই রেশম পথে আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে সিল্ক ছিলো বিলাসবহুল ও মূল্যবান পণ্য। যার উৎপাদনে সেরা ছিলো চীন। এক সময় এই পণ্যটি ইউরোপীয় ও মধ্য এশিয়ার বণিকদের মাঝে ব্যাপক আকর্ষণ সৃষ্টি করে।  বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো স্বর্ন , আইভারি , পশম, কাঁচের জিনিসপত্র , ঘোড়া । 

রেশম বা সিল্ক বণিকদের কে এতটাই আকর্ষণ করেছিল যে  তারা এসকল মূল্যবান পন্যের বিনিময়ে চীন থেকে সিল্ক ক্রয় করে নিয়ে যেতো। সিল্ক বা রেশম কে কেন্দ্র করে আন্তঃদেশীয়  বানিজ্য বেশ জমজমাট হয়ে উঠায় প্রয়োজন পরে একটি নিরবিচ্ছিন্ন বানিজ্য পথের। ফলে, পণ্য সামগ্রী আনা- নেওয়া ও ভ্রমণ সহজীকরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু হয় সিল্ক রোডে।

সিল্ক বা রেশম পথের ইতিহাস 

সিল্ক রোড
সিল্ক রোড | Image Source- britannica

সিল্ক রোডের ইতিহাস হান সাম্রাজ্যের অনেক আগে শুরু হলে ও এর সূচনা ঘটে হান সাম্রাজ্যের রাজধানী চেং এন এ যা বর্তমানে জি এন নামে পরিচিত। পারস্য দেশ ইরানের রয়্যাল রোড কে সিল্ক রোডের প্রধান সংযোগ বলা চলে। কারণ সিল্ক রোডের উদ্ভব ঘটার ৩০০ বছর পূর্বেই দা রয়্যাল রোড তার যাত্রা শুরু করে যার বিস্তৃতি ইরান থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত ছিলো। আর সেই সময়ে এই রাস্তাটি নির্মিত হয়েছিল পারস্যের তৎকালীন শাসনকর্তা দারিয়াস এর মাধ্যমে । আস্তে আস্তে যুক্ত করতে শুরু করে ছোট ছোট বানিজ্য পথগুলোকেও। মেসোপটেমিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ, মিশর হয়ে উত্তর আফ্রিকা ইত্যাদি এমনকি  পরবর্তীকালে তৎকালীন মেসেডোনিয়ার রাজা অ্যালেকজান্ডার দ্য গ্রেট তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে রয়াল রোড হয়ে পারস্য পর্যন্ত। 

হাজার হাজার বছরের পুরনো এই সিল্ক রোড প্রথম পর্যায়ে নিজেদের রাজ্যের মধ্যেই সিল্ক বাণিজ্যের জন্যে ব্যবহৃত হতো। তখন মূলতঃ হান সাম্রাজ্যের রাজধানী থেকেই ব্যবসায়ী, তীর্থ যাত্রী, দূত এদের কাফেলা যাত্রা শুরু করতো।এখান থেকেই তারা চীনের উত্তর প্রদেশ দিয়ে এগিয়ে পশ্চিমের দিকে গভীর মরুভূমি হয়ে পৌঁছত। এই গভীর মরুভূমি ছিলো   এশিয়ার সব চাইতে বড় মরুভূমি।  শুধু তাই নয়, গভীর মরুভূমি ছিলো সিল্ক রোডের সবচাইতে বিপদজনক ও রোমাঞ্চকর একটি অংশ। 

এটি বর্তমান সময়ে চীন ও মঙ্গোলিয়া জুড়ে বিস্তৃত। এই মরুভূমির এক এক স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ এক এক রকম কিন্তু পুরো মরুভূমি  ছিলো পাথরে ঢাকা ও রুক্ষ। আর এই পাথরের উপস্থিতি থাকাতে এই পথের যাত্রীরা পথ দিয়ে চলাচল করা তুলনামূলক সহজ মনে করতেন।  কিন্তু এই উত্তপ্ত মরুভূমি কে যারা যতায়েতে র জন্যে বেছে নিতেন তাদের জন্যে সব চাইতে কঠিন ব্যাপার ছিলো যাত্রাপথে পানির উপস্থিতি খুঁজে বের করা। শুধুমাত্র নিজেদের জন্যে নয়, নিজেদের পণ্যবাহী উট গুলোর পানির প্রয়োজন হতো । আর পানির এই সমস্যা দূরীকরণে যাত্রা পথের বিভিন্ন স্থানে প্রায় একদিন অতিক্রম করার মত দূরবর্তী স্থানে এক একটি সরাই খানা স্থাপন করা হয়। 

এইসব সরাই খানাতে যাত্রীরা বিশ্রাম নিতেন এবং তাদের বাকি পথ অতিক্রম করার জন্যে পানি , খাবার সামগ্রী এবং অন্যান্য জিনিসপত্র এখন থেকে সংগ্রহ করতে পারতেন। এর ফলে বানিজ্যিক কাফেলাদের লম্বা সময় পর্যন্ত মরুভূমিতে অবস্থান করা লাগতো না। কেননা, তৎকালীন সময়ে বানিজ্যিক কাফেলা দের পিছু নিত আদিবাসী গোষ্ঠীর ডাকাত দল। তাই  জান মাল ঠিক রেখে এই পথ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া ছিলো বেশ চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন।  কাফেলাগুলো গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলে ব্যবসায়ীরা পেতেন মোটা অঙ্কের মুনাফা। কিন্তু একপর্যায়ে ডাকাত দল গুলোর আক্রমণের কারণে বানিজ্য পরিচালনা করা বেশ দুষ্কর হয়ে পড়ে।  পরবর্তীতে  বানিজ্য রক্ষার্থে এবং কাফেলা গুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হান সাম্রাজ্যের  বিখ্যাত সম্রাট হান উদি আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য ঝাং কিয়ান কে  দূত হিসেবে নিযুক্ত করেন।

জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এভাবেই চীন পশ্চিমের ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র গুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে থাকে এবং একসময় সফল ও হয়। আর এই কূটনীতিবিদ ও আবিষ্কারক বাণিজ্যের এক  নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে যার ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বানিজ্য ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে।

 সেই থেকেই ব্যবসায়ীগণ সিল্ক রোডে নিরাপদ ভ্রমণ ও বানিজ্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।

অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সিল্ক রোডের গুরুত্ব :

আজকের পৃথিবীতে সভ্যতা সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিল্ক রোডের গুরুত্ব অপরিসীম। সিল্ক রোডের অবদানেই চীন, কোরিয়া , জাপান, ভারতীয় উপমহাদেশ , ইরান , হর্ন অব আফ্রিকা ও ইউরোপে  সভ্যতার মধ্যে সুদুরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো।

যদিও সিল্ক বা রেশম পথের মূল বানিজ্য পণ্য ছিলো এশিয়ান সিল্ক , তবে এই পথে আরো কিছু বিশেষ পণ্য বিনিময় হতো। যেমন : ধর্ম, জ্ঞান , প্রযুক্তি ইত্যাদি।

শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্ক নয় বরং সিল্ক রোডের মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কৃতির আদান প্রদান ও ঘটে একে অপরের উন্নতির লক্ষ্যে।প্রতিটি সভ্যতার ভাষা থেকে শুরু করে শিল্প,  সাহিত্য, দর্শন , স্থাপত্যকলা এমনকি ধর্মসহ প্রতিটি সভ্যতার সমস্ত কিছু  ছড়িয়ে পরে সিল্ক রোডের মাধ্যমে।

অবশেষে রোগ ছড়ানো টা ও বাকি রইলো না। ৫৪২ সালে ছড়িয়ে পরে প্লেগ নামক এক ভয়াবহ রোগ। এমনকি তা পৌঁছে যায় বাইজন্টিন পর্যন্ত। যা ধ্বংস করে বাইজন্টিন সাম্রাজ্যকে। এর পরেই ইতি ঘটে সিল্ক রোডের বানিজ্যের। চীন এই পথটি বন্ধ করে দেয়ায় ব্যবসায়ীরা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় সমুদ্রপথ। আর এখন থেকেই শুরু হয় আবিষ্কারের যুগ। এভাবেই  বিশ্বের উন্নয়নে সূচনা করে যায় সিল্ক রোড বা রেশম পথ।

 একুশ শতকে এসে প্রাচীন সিল্ক রোডের বানিজ্য কে অনুসরণ করে চীন সরকার চীন ও ইউরোপকে যুক্ত করার জন্যে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যার নাম ছিলো ” ওয়ান বেল্ট ওয়ন রোড ”  । পরবর্তী তে এই উন্নতি কাঠামোতে সিল্ক রোডের সাথে যুক্ত দেশ গুলো কে ছাড়াও যুক্ত করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও পূর্ব আফ্রিকা কে। তাই পুনরায় এর নামকরণ করা হয় ” বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনশিয়েটিভ। ” 

বর্তমান সিল্ক রোড বা ওয়ান বেল্ট ইনশিয়েটিভ রোডের অন্তর্ভূক্ত করিডোর দুটি হলো দ্য নিউ ইউরেশিয়ান ল্যান্ড ব্রিজ , ম্যারিটাইম সিল্ক রোড। মূলতঃ ২০১৩ সালে চীন সরকার শি জিনপিং এর প্রস্তাবের পরেই এই পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে। সেই সাথে এটি চীনের সমগ্র বিশ্ব বানিজ্যে রাজত্ব করার একটি কৌশল বলা হয় যার কারণে অনেক দেশ এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হতে অসম্মতি জানায়। সুতরাং, আজকের দিনের চীন তাদের পূর্বপুরুষদের মতই কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের উন্নয়ন ঘটাতে মোটেও পিছিয়ে নয় ।

মেহেরুন নেসা তন্বী ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button