ইতিহাস

যুগে যুগে মহামারি – ভারতীয় কলেরা মহামারি- ১৮১৮ এর ইতিহাস | ভারতে মারা যায় ৯ লাখ মানুষ !

ঐতিহাসিকগণ কলমের কালিতে পাতায় পাতায় সংরক্ষণ করেছেন চিরজীবন্ত সময়ের স্রোতকে। সেই ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে আমরা অতীতের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি , শিক্ষা নিতে পারি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে। সময়ের স্রোতে কারা টিকে থাকে? যারা শক্তিশালী, তারাই সময়ের স্রোতের জোয়ারে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে পারে। সময় মাঝেমধ্যে আমাদের সামনে কঠিন আঘাত নিয়ে হাজির হয়। চক্ষুদ্বয় বিস্মিত হয় যখন দেখি প্রতি ১০০ বছরে কোনো না কোনো মহামারী বিশ্বের সম্মুখে শত্রু হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। ১৭২০,১৮২০,১৯২০ আর বর্তমান ২০২০ এই প্রতি ১০০ বছর অন্তর অন্তর বিশ্ব কঠিন মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এমন নয় যে এই সালগুলো ছাড়া অন্য কোন সালে কোন মহামারি হয়নি। বরং অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন ধরনের মহামারী দেখা দিলেও এই প্রতি ১০০ বছর পর পর কঠিন বৈশ্বিক মহামারী  মানুষের জীবনকে লণ্ডভণ্ড করতে একটুও ভুলেনি। আজ কথা বলব ১৮২০ সালে সংঘটিত বৈশ্বিক কলেরা মহামারী নিয়ে।

ভয়াবহ কলেরা মহামারীর শুরুটা হয়েছিল ১৮১৮ সালে। ভারতের গঙ্গা নদী সেকালেও হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য একটি ভক্তির জায়গা ছিল। তারা এটাকে পবিত্র মনে করতো এবং গঙ্গা মাতা বলে ডাকতো। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতো । প্রতিবছর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে হাজার হাজার তীর্থযাত্রীরা সেখানে একত্রিত হতো। দূরদূরান্ত থেকে আগত এসব তীর্থযাত্রীদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার তেমন সুযোগ বা অভ্যাস কোনটাই ছিল না। ফলে তারা নদীর তীরে যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করতো আবার সেই দূষিত পানি কোনরূপ ফুটানো বা জীবাণুমুক্ত করা ছাড়াই সেগুলো তারা পান করত এবং রান্নায় ব্যবহার করতো। সেই জীবাণুযুক্ত দূষিত পানি দিয়েই তারা গোসল করতো, হাতমুখ ধুতো। যার ফলে তাদের শরীরে ভয়ানক জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তি  জলের মতো মলত্যাগ করা শুরু করে। শুধু তাই নয় প্রচন্ড পেট ব্যথা, পানি-শূন্যতা এবং প্রতিমুহূর্তে বমি করা ছিল কলেরা রোগের অন্যতম কিছু লক্ষণ। এরপর ধীরে ধীরে পানিশূন্যতায় রোগী কাতর হয়ে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়তো। যেহেতু কলেরা একটি সংক্রামক রোগ এবং তীর্থযাত্রীরা হাজার হাজার মানুষ একসাথে অপরিচ্ছন্ন ভাবে অবস্থান করতো , তাই খুব দ্রুতই সবার মধ্যে এই রোগটা ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে আশেপাশের এলাকার মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হয়।  তীর্থযাত্রীরা যখন তাদের নিজেদের এলাকায় ফিরে যায় তখন তারা সেখানের মানুষদেরও এ রোগে আক্রান্ত করে। এভাবে ধীরে ধীরে কলেরার জীবাণু সমগ্র ভারত কে গ্রাস করে ফেলে। যদিও এর পূর্বেও ভারতে অনেকবার কলেরা মহামারী দেখা গিয়েছিল। কারণ, তৎকালীন ভারতের অধিবাসীরা অত্যন্ত অপরিষ্কার এবং অপরিচ্ছন্ন ভাবে বসবাস করতো। তারা যে পুকুরের পানি পান করত এবং রান্নায় ব্যবহার করত সেই পুকুরের পাশেই তারা তাদের মলমূত্র ত্যাগ করতো । নির্দিষ্ট স্থানে মূত্রত্যাগ এবং নিজেদের হাত মুখ পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে তারা যথেষ্ট বেখেয়াল ছিল।

আর্টিকেল পড়তে ভাল লাগছে না, তাহলে ভিডিও দেখুন

 আঠারো শতকের  কলেরা মহামারী টি ছিল পূর্বের মহামারী গুলো থেকেও আরো অনেক বেশি ভয়ংকর। উৎসবে আগত তীর্থযাত্রীদের মাধ্যমে এই কলেরা মহামারী সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আয়ত্তাধীন।  ভারতে অবস্থিত ব্রিটিশ সৈন্যরা কলেরা আক্রান্ত হয় এবং অনেক ব্রিটিশ সৈন্য মারা যায় । আবার কিছু ব্রিটিশ সৈন্য এই কলেরা জীবাণু অন্য দেশে বহন করে নিয়ে যায়। ব্যবসার উদ্দেশ্যে আগত নাবিকরা কলেরার জীবাণু বহন করে অন্যান্য দেশে মানুষদের সংক্রমিত করে। এভাবে সমগ্র ভারতে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর ধীরে ধীরে তা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে । ১৮২০ সালের মধ্যে এই কলেরা মহামারী এশিয়ার প্রায় প্রত্যেকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সুদূর চীন এবং মধ্য প্রাচ্যেও । অনেক ব্রিটিশ সৈন্য মারা যাওয়ার ফলে এই কলেরা মহামারীর ভয়াবহতা ব্রিটিশদের নজরে আসে। কিন্তু ভারতবাসীরা চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর অবহেলার শিকার হয়। যেহেতু তাদের মাধ্যমেই মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো তাদের কে চরম অবহেলা এবং ঘৃণার পাত্র হিসেবে দেখতে থাকে।

১৮১৮ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত কলেরা মহামারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। ১৮২৪ সালে অবশেষে এই মহামারীর অবসান হয়। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করে, সেই সালে প্রচন্ড শীত পরার কারণে হয়তো কলেরার জীবাণু পানিতে মরে গিয়েছিল। কিন্ত এর পিছনে তারা কোনো শক্ত প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। যে কারণেই হোক না কেন ১৮২৪ সালে অবশেষে এই ভয়ঙ্কর মহামারীর ইতি ঘটে । শুধুমাত্র ভারতেই মহামারী চলাকালীন প্রতিবছর প্রায় দেড় লক্ষের মত মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ৬ বছরে ভারতে মোট ৮,৭৫,০০০ মানুষ মারা যায়। সম্পূর্ণ এশিয়াতে সর্বমোট মৃত্যুর হার টা ছিল আরো বেশি ,যদিও তার সঠিক একটা সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি।

ফাতিমা বিনতে মুস্তাফিজ ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর- AFB Daily )

তথ্য সূত্র : বিবিসি নিউজ উইকিপিডিয়া ব্রিটানিককা

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button