ইতিহাসসাম্প্রতিক

আফিম যুদ্ধের ইতিহাস, বাণিজ্যে না পেরে মাদকদ্রব্য আফিম দিয়ে চীনকে কুপোকাত করেছিল ব্রিটিশরা !

ঘড়ির কাঁটা উল্টিয়ে ফিরে যাওয়া যাক অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে। সে সময়ে সমগ্র বিশ্বে চীন ছিল অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। আর অপরদিকে ইউরােপে তখন শিল্প বিপ্লব ধীরে ধীরে আরো জোরদার হচ্ছিল। চীনের প্রতি ব্রিটিশদের লোলুপ দৃষ্টি থাকলেও তৎকালীন চীন সম্রাটের শক্ত অবস্থানের কারণে তারা তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারছিল না । তবুও মনে মনে তারা চীনের সম্পদ এবং ঐশ্বর্যে ভাগ বসানো এবং চীনের বন্দরকে ব্যাবহার করে আরো বৃহৎ পরিসরে তাদের বাণিজ্য অঞ্চলের পরিসীমা বাড়ানোর ফন্দি আটতে থাকে। তাই তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তারা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়।

পশ্চিমারা চীনের সমগ্র জনগােষ্ঠীকে মাদকাসক্ত করার মাধ্যমে চীন দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, যুবসমাজের সাহস ও নৈতিকতার অটুট বন্ধনকে বিনষ্ট করার ঘৃণ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে । এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা চীনে আফিম চোরাচালান শুরু করে। আর এরই ফলাফল হিসেবে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক আফিম যুদ্ধ ।

আফিম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল চীন আর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের মধ্যে। আফিম যুদ্ধকে প্রথম ইঙ্গ-চীন যুদ্ধ
হিসেবেও নামকরণ করা হয়। ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ সাল অবধি এ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল । এই যুদ্ধটি চীনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে কেননা এর মাধ্যমে চীনের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছিল ।

ইতঃপূর্বে চীনের জনগণ আফিমকে মাদক হিসেবে ব্যাবহার জানতো না বরং তারা এটিকে বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে ব্যাবহার করতো । আর এই আফিমের মূল চালান আসতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হতে ।

আর্টিকেল পড়তে ভাল লাগছে না, তাহলে ভিডিও দেখুন !

প্রথম দিকে চীন এবং ব্রিটিশদের মধ্যকার ব্যবসা ছিল সোনা-রুপার । কিন্তু ব্রিটিশরা এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছিল না, এর মূলে ছিল বাণিজ্য বিরোধ এবং বাণিজ্য ঘাটতি । চীন রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে ব্রিটিশদের কাছে চা রপ্তানি করতো কিন্তু কোনো ব্রিটিশ পণ্য ক্রয় করতো না । এর ফলে চীনের সাথে ব্রিটিশদের ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দেয় এবং ব্রিটিশদের রৌপ্যের মজুদ ফুরিয়ে আসছিল । তারা যখন বুঝতে পারে যে চীনে বেশ আফিমের চাহিদা আছে তখন তারা সােনা রুপার সাথে চোরাচালানের মাধ্যমে আফিমও আনতে থাকে। মূলত চীনের জনগণ ব্রিটিশদের থেকেই আফিমকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করা শিখে।

তৎকালীন ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অন্তর্ভুক্ত একটি পরাধীন ভূখণ্ড। এখানে উৎপাদিত আফিম ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহযােগিতায় চোরাচালানের মাধ্যমে চীনে প্রেরণ করা শুরু করে। চীনারা জনগণ আফিমের নেশায় ব্যাপকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে । এক হিসাব মতে দেখা যায় যে, যেখানে ১৮০০ সালে চীনের মোট আমদানীকৃত আফিমের পরিমাণ ছিল ২ হাজার পেটি, সেটি ধারাবাহিকভাবে ১৮২০ সালে ১০ হাজার পেটি এবং ১৮৩৮ সালে ৪০ হাজার পেটিতে পৌঁছায় । আফিম যুদ্ধের পর এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ হাজার পেটিতে । এভাবেই আফিম রপ্তানি এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা চীনাদের সামজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠেলে দেয় ।

এতে কয়কটি প্রদেশের নব্বই পারসেন্ট লোক মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে । প্রাথমিক পর্যায়ে চীনার আফিমের বিনিময় মুল্য পরিশোধ করতো তাদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী দিয়ে যেমন- চিনামাটির বাসন, রেশম এবং চা ইত্যাদি । কিন্তু ক্রমেই চাহিদা বাড়ায় আফিমের মুল্য বেড়ে যায় এবং সাধারণ পণ্য দিয়ে এর মুল্য পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না । এর ফলে তারা রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে আফিম ক্রয় করতে থাকে এবং চীনের রৌপ্যের ভাণ্ডার অল্প কিছু দিনের মধ্যে শেষ হওয়া শুরু করে । এতে করে সারা রাজ্যে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা শুরু হলে সম্রাটের টনক নড়ে।

তাই এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ এর জন্য ১৮০০ সালে চীনা সরকার বিজ্ঞপ্তি বা হুকুম জারি করলেন, দেশে কোনাে অবস্থাতেই আফিম আমদানি করা চলবেনা। এদিকে এই আফিমের ব্যবসা ব্রিটিশদের কাছে ছিল অসম্ভব লাভজনক। আফিম ব্যবসার টাকা তখন চা এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি করার জন্য ব্যবহৃত হত। তাই তারা এই ব্যবসা গুটাতে কিছুতেই আগ্রহী ছিলনা। তারা গােপনে গােপনে আফিমের বিক্রি চালিয়ে যেতে লাগলাে। সরকারি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তারা মােটা অংকের টাকা উৎকোচ দিত। ধীরে ধীরে চীনা সরকার একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে ব্রিটিশ বণিকদের এই অবৈধ ব্যবসার প্রসারে। শেষ পর্যন্ত চীন সরকার ঠিক করলেন এই মাদক ব্যবসা বন্ধ করার জন্য বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মকর্তা নিয়ােগ দেবেন।

স্পেশাল অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হলেন লিন নামের এক চৌকশ কর্মকর্তা। যেহেতু দক্ষিণ চীন ছিল এই অবৈধ ব্যবসার সবচেয়ে বড় আড্ডাখানা,তাই লিন সেখানে গিয়ে আদেশ জারি করলেন সমস্ত ইংরেজ বণিকদের কাছে যত আফিম আছে সব সরকারের কাছে জমা দিতে। ১৮৩৯ সালের ১০ মার্চ লিন ক্যান্টন শহরের যে অঞ্চলে বিদেশি বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠেছিল, সেই অঞ্চল অবরােধ করেন। তিনি ব্রিটিশ সুপারেন্টেন্ড ক্যাপ্টেন চার্লস এলিয়ট( Charles Elliot)সহ ৩৫০ জন ব্রিটিশ বণিকদের অবরুদ্ধ করেন এবং তাদের ২০,০০০ আফিমের বাক্স বিনষ্ট করে দেন। চীনের এহেন পদক্ষেপকে সহ্য করতে না পেরে এলিয়ট লন্ডনে সৈন্য পাঠানাের অনুমতিতে চিঠি লিখে। এভাবে পরিস্থিতি যখন ক্রমশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তখন এক ইংরেজ নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে, যা কে কেন্দ্র করে সূচনা হয় প্রথম ইঙ্গ চীন যুদ্ধ ।

লন্ডন হতে সৈন্য আসার আগপর্যন্ত বেশ কয়েকটি সংঘাতের পরে ১৮৩৯ সালের নভেম্বরে আসল লড়াই শুরু হয়েছিল। ক্যান্টন (Canton) থেকে ব্রিটিশ শরণার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার সময় এইচএমএস “ভােলাজ” (HMS Volage) এবং এইচএমএস ‘হায়াসিন্থ’ (HMS ‘Hyacinth”)২৯ টি চীনা জাহাজকে পরাজিত করে। পরের বছর ২১ শে জুন, কমােডাের স্যার গর্ডন ব্রেমার (Gordon Bremer)দ্বারা পরিচালিত একটি নৌ বাহিনী মাকাও (Macao)থেকে আগত হয়। এরপরে এটি উত্তরের দিকে চুশানে(Chusan) চলে যায় এবং ৫ জুলাই টিং-হাই (Ting-hai)বন্দরে বােমা ফাটায়, যা পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল জর্জ বুরেলের (George Burrell)সেনাবাহিনী দ্বারা দখল করা হয়েছিল। প্রায় দুই বছরের মতাে সর্ব শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করার পর ভাগ্যের নির্মম পরিনতি হিসেবে চীনা শক্তি পরাজিত হয়।

এ যুদ্ধে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি চীনা সৈন্য মারা যায় অপরদিকে মাত্র ৩৫০ জনের কাছাকাছি ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়। এই যুদ্ধের পর ইংরেজ ও চীনদের মাঝে ১৮৪২ সালের ২৯ আগস্ট ঐতিহাসিক নানকিং চুক্তি সাক্ষরিত হয়। ব্রিটিশরা এই চুক্তির মাধ্যমে আফিমের বাণিজ্য করার বিশেষ অধিকার লাভ করে এবং হংকং দ্বীপ দখল করে নেয়। প্রায় ২৫০ বছর হংকং দ্বীপ তাদের দখলে থাকে।

বেশ কিছু কারনে এই নানকিং এর সন্ধি সুদূর প্রাচ্যের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয় । প্রথমত,এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে চীনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এই দুর্বলতার সুযােগে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ চীনের ওপর একের পর এক অসম চুক্তি চাপিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ চীনের মর্যাদা বিনষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, চুক্তি অনুযায়ী হংকং বিদেশিদের দখলে যাওয়ার ফলে চীনের আঞ্চলিক অখন্ডতা বিপন্ন হয়। উপরন্তু বিদেশি পণ্যের উপর চীন যথেষ্টভাবে শুল্ক আরােপের অধিকার হারায়, যা ছিল চীনের সার্বভৌম ক্ষমতার পরিপন্থী।

এক কথায় , এই সন্ধির ফলে চীনের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। চীনারা বিদেশী বণিকদের কাছে তাদের পাঁচটি বন্দর উন্মুক্ত করতে বাধ্য হয়। এবং বিদেশি পণ্যের উপর অত্যন্ত অল্প পরিমাণে বাণিজ্য শুল্ক ধার্য করে। যার ফলশ্রুতিতে বিদেশি পণ্য চীনের বাজারে স্রোতের মতাে ঢুকতে থাকে। এ পর্যন্ত চীনের অর্থনীতি গ্রামীণ এবং সম্পূর্ণ আত্ননির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা বিনষ্ট হয় বিদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশের ফলে। চীনের অর্থনীতি ক্রমশ উপনিবেশ-অর্থনীতি তে রূপান্তরিত হয়। দেশীয় শিল্প বিনষ্ট হওয়ায় অসংখ্য মানুষ আঁধারে পতিত হয়। চীন দেশে পাশ্চাত্যশক্তিবর্গের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের এটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ এবং এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যখন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে চীন বিদেশি রাষ্ট্রগুলাের প্রভাবাধীন এলাকাতে বিভক্ত হয়ে উপনিবেশের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে।

ফাতিমা বিনতে মুস্তাফিজ ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

তথ্য সূত্র :

উইকিপিডিয়া
কালের কণ্ঠ
দৈনিক অধিকার ডট নিউজ
দৈনিক বাংলাদেশ
ছাড়পোকা ডট অর্গানাইজেশন
ঘটনা ডট কম
ব্রিটানিকা
স্টাডি ডট কম
এলাইভ হিস্টোরি ডট কম
হিস্টোরি টুডে

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button