জীবনী

মোগল সাম্রাজ্যের অতন্দ্র-প্রহরী খান-ই-খানান বৈরাম খাঁ এর জীবনী

মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত এক নাম বৈরাম খাঁ। সম্রাট হুমায়ুন এবং আকবরের সেনাপতি এবং উপদেষ্টা পাশাপাশি হুমায়ুনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও শ্রদ্ধেয় সভাসদ ছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই সম্রাট আকবরের সিংহাসনে বসার পেছনে যার অবদান অনস্বীকার্য তিনি হলেন বৈরাম খাঁ। শুধু আকবরের জন্যেই নয়, বৈরাম খাঁ বিখ্যাত হয়ে থাকবেন আকবরের পিতা সম্রাট হুমায়ূনের বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবেও। ভারত উপমহাদেশে মোগল সাম্রাজ্য বিস্তারে তার একনিষ্ঠতা, বিশ্বস্ততা এবং অবদান ছিল প্রশ্নাতীত।

 
১৫০১ সালে আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশের কারা কোনলু প্রদেশের বাহারলু তুর্কোমান গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন বৈরাম খাঁ। বৈরাম খাঁর পিতা সাইফ আলী বেগ বাহারলু ও দাদা জানালী বেগ বাহারলু সম্রাট বাবরের কর্মচারী ছিলেন। বৈরাম খাঁর দাদার বাবা, পীরালি বেগ বাহারলু ছিলেন সম্রাট বাবরের স্ত্রী পাশা বেগমের ভাই। বৈরাম খাঁ’র পূর্বপুরুষরা সম্রাট বাবরের নিরাপত্তায় নিযুক্ত ছিল । পূর্ব পুরুষদের ন্যায় বৈরাম খাঁও মাত্র ১৬ বছর বয়সে সম্রাট বাবরের কর্মচারী হিসেবে রাজ পরিবারে গমন করেন।
বৈরাম খাঁ’র মূল পদবী ছিল ‘বেগ’। তার সাহসীকতা ও বিশ্বস্ততার স্বীকৃতি হিসেবে মোগল দরবারে তাকে ‘ইয়ার-ই-ওয়াফাদর’ (অনুগত বন্ধু), ‘খান-ই- খানান’ (রাজাদের রাজা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৫২৭ সালে সম্রাট বাবর ও রাজপুত সৈন্যদের মাঝে রাজস্থানের ভরতপুর জেলার অদূরে খানওয়া গ্রামে এক যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। রাজ পরিবারে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম বৈরাম খাঁর বীরত্ব প্রদর্শিত হয় খানওয়া যুদ্ধে।  পরবর্তীতে ১৫২৯ সালে বাবর ও সুলতান মাহমুদ লোদির মধ্যকার ‘ঘাগড়া’ যুদ্ধেও অংশ নেন বৈরাম। ক্রমান্বয়ে তিনি হুমায়ূনের সেনাবাহিনীর অংশ হয়ে বেনারস, বাংলা ও গুজরাট দখলের অভিযানে অংশ নেন। তিনি হয়ে উঠলেন সম্রাটের আস্থাভাজন বিশ্বস্ত এক সৈনিক। 
সম্রাট হুমায়ূনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কয়েকবারই হুমায়ূনকে শের শাহের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন কামরান মীর্জা। সেই ঘোর ক্রান্তিকালেও হুমায়ুনের পাশে ছিলেন বৈরাম খাঁ। শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে সিংহাসন হারানোর পরও হুমায়ন এবং তার পত্নির সঙ্গ ছাড়েননি বৈরাম খাঁ। বরং প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে গেছেন হারনো সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার। পরবর্তীতে সম্রাটের নির্দেশে বৈরাম খাঁ কান্দাহার পুনরুদ্ধার করেন। ১৫৫৬ সালে সম্রাট হুমায়ূন যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন সিকান্দর শাহের বিশাল বাহিনীকে বলতে গেলে একা হাতে পরাজিত করে দিল্লীতে মোঘল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বৈরাম খাঁ। 

আর্টিকেল পড়তে বিরক্ত লাগছে তাহেল ভিডিও দেখুন


দিল্লীর মসনদে পুনরায় আরোহন করলেন সম্রাট হুমায়ুন। বৈরাম খাঁ’র কর্মদক্ষতা, পান্ডিত্য, বিচক্ষণতা আর আনুগত্যে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট হুমায়ুন তার এই বিশ্বস্ত সেনাপতিকে সর্বোচ্চ সম্মান ‘খান-ই-খানান’ যার অর্থ ‘রাজাদের রাজা’ সম্মানে ভূষিত করেন। পরবর্তীতে মোঘল পরিবারেরই এক কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বৈরাম খাঁ। 
সম্রাট হুমায়ূন যখন পরপারে পাড়ি জমান, তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারী শিশুপুত্র আকবর তখন তের বছরের এক নাবালক।১৫৫৬ সালে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন হুমায়ূনের পুত্র আকবর। অপরিপক্কতা এবং পারদর্শীতার অভাবে 
মারা যাওয়ার আগে হুমায়ূন ঘোষণা দিয়ে বৈরাম খাঁকে আকবরের অভিভাবক নিযুক্ত করে যান, এবং বলে যান, আকবর উপযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আকবরের পেছনে থেকে মোঘল সাম্রাজ্য পরিচালনা করবেন বৈরাম খাঁ ই। নাবালক আকবরের অভিভাবক হিসেবে বিশ্বস্ততার সহিত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন বৈরাম খাঁ। কিন্তু বিষয়টিকে খুব ভালভাবে নিতে পারলেন না আকবরের মাতা হাসিনা বানু ও রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।  তারা আশংকা করতে থাকে বৈরাম খা কি আদৌ আকবরকে সিংহাসনে বসাবে? প্রতাপশালী বৈরাম হয়তো আকবরকে তার হাতের পুতুল বানিয়ে রেখে নিজেই সাম্রাজ্য দখল করে নেবেন। হাসিনা বানু এ বিষয়টি নিয়ে আকবরকে নানাভাবে প্ররোচিত করতে থাকে। বৈরাম খাঁয়ের প্রতি আকবরের বিরোপ মনোভাব তৈরি করতে সচেষ্ট হোন তারা।
কিন্তু স্বচ্ছ ও একনিষ্ঠ মনের অধিকারী বৈরামের মনে এ ধরনের কোন ভাবনা ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন উপযুক্ত হলেই আকবরকে দিল্লীর মসনদে বসাবেন৷ সম্রাট হুমায়ুনের বিশ্বাসের প্রতিদান দিবেন। 


১৫৬০ সাল। আকবর তখন ১৮ বছরের যুবক। বৈরাম খাঁ কে অব্যাহতি দিয়ে দিল্লীর মসনদে আরোহন করেন হুমায়ুন পুত্র আকবর। কোনভাবেই আর বৈরাম খাঁকে তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। নানা ফন্দি আঁটছিলেন কীভাবে বৈরামকে রাজ পরিবার থেকে বিতাড়িত করা যায়। অন্যদিকে বৈরাম খাঁ চেয়েছিলেন বাকি জীবন টা আকবরের পাশে থেকে রাজ পরিবারে কাটাতে। কিন্তু সেই সৌভাগ্য তার হয়ে উঠলো না। আকবর তাকে এবং তার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি জায়গা বরাদ্দ করেন।
আকবরের এসব আপত্তিকর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে বৈরাম তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কিন্তু বৈরাম খাঁ আকবরের সাথে আর কোনভাবেই পেরে উঠলেন না। আকবরের কাছে ক্ষমা চাইলে আকবর তাকে ক্ষমা করে বিশ্রামে যাওয়ার শর্ত দেন।
ঐতিহাসিক আবুল ফজলের লেখা ‘আইন-ই-আকবর’ বইয়ের ৩২৪-২৫ পৃষ্ঠায়ে উল্লেখিত আকবরের বার্তাটি ছিল এমন-


“আপনার সততা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত রয়েছি। আমি আপনাকে এই সাম্রাজ্যের সবধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করছি। এখন থেকে এই সাম্রাজ্য পরিচালনায় সবধরনের সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার একান্ত ইচ্ছে আপনি দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে অবসর নিয়ে পবিত্র মক্কার উদ্দেশে তীর্থযাত্রা শুরু করুন। এই মোগল সাম্রাজ্যকে দীর্ঘদিন সেবা করার জন্য হিন্দুস্থানের একটি উপযুক্ত জায়গা আপনার পরিবার, আপনার জীবনধারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রদান করা হচ্ছে যা থেকে উপার্জিত রাজস্ব আপনার এবং আপনার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রেরণ করা হবে। ”
সেনাপতির পদ ত্যাগ করে সম্রাটের আদেশের প্রতি সম্মান রেখে তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু আকবর তাঁকে নিজের পথের কাঁটা ভেবে চিরদিনের জন্য নিশ্চিন্ন করে দিতে চেয়েছিলেন। 


মক্কা অভিমুখে সম্রাটের প্রেরিত গুপ্তঘাতকের হাতেই প্রাণবিয়োগ ঘটে মোঘল সাম্রাজ্যের এই নিবেদিতপ্রাণ সেবকের। আবার অন্য পক্ষের মতে, এই গুপ্তহত্যার পেছনে সম্রাট আকবর নন, রয়েছে শের শাহের প্রধান সেনাপতি হিমুর আজ্ঞাবহ সৈনিকরা, যে হিমুকে বৈরাম খাঁ হত্যা করেছিলেন অত্যন্ত নির্মমভাবে। ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি গুজরাটে মৃত্যুবরণ করেন মোগল এই সেনাপতি।সম্রাট আকবরের আলোকিত শাসনকালে সবচেয়ে বড় কলঙ্কের দাগও বোধহয় এটিই!

মোহাম্মদ আজাদ হোসাইন ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button