ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশে স্বর্ণযুগ খ্যাত গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশের ভূমির গঠন এবং জলবায়ুর বৈচিত্র্য হাজার বছর ধরে অসংখ্য গল্প তৈরির কারিগর হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। এ মাটিতে, সময়ের স্রোতে সৃষ্টি হয়েছে জানা অজানা বহু গল্পের সাম্রাজ্য। আবার তারই স্রোতের জোরে ধ্বংসও হয়েছে অনেক। আর,তার মাঝে সবচেয়ে পুরনো সাম্রাজ্যগুলোর একটি হলো গুপ্ত সাম্রাজ্য, যারা মৌর্য সাম্রাজ্যের মতো মগধ অঞ্চল শাসন করেছিল।


গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিল একটি প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য। আনুমানিক ৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে এই সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল।মহারাজ শ্রীগুপ্ত(srigupta), ধ্রুপদি সভ্যতা-র আদর্শে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শিলালিপি, প্রশস্তিলিপি, তাম্রশাসন, মুদ্রা, সাহিত্যিক উপকরণ এবং বিদেশিদের বর্ণনা থেকে বাংলায় গুপ্ত শাসন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটালিপুত্র। সাম্রাজ্যবাদী গুপ্তদের আদি পরিচয় সম্পর্কে পন্ডিত-গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ধারণা করা হয়, পাটলীপুত্র (মগধের অভ্যন্তরে) নগরের অদূরে শ্রীগুপ্তের রাজত্ব ছিল। অন্যদিকে ধীরেন্দ্র চন্দ্র গাঙ্গুলী ও চৈনিক পরিব্রাজক ই-ৎসিঙ্ (I-ching or I-tsing)এর বর্ণনার ভিত্তিতে গুপ্তদের আদি বাসস্থান মগধে নয় বরং বাংলার মুর্শিদাবাদ ছিল বলে জানা যায় ।মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর দাক্ষিণাত্যে সাতবাহন ও উত্তর ভারতে কুষাণ সাম্রাজ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে কিছুটা সক্ষম হয়। তাদের পতনের প্রায় ৫০ বছর ছোটো ছোটো স্থানীয় রাজারা বঙ্গদেশের বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করা শুরু করে। আর এভাবেই গুপ্ত বংশের আদিপুরুষ শ্রীগুপ্ত খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর শেষে অথবা চতুর্থ শতাব্দীর প্রারম্ভে কোনো একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন, কিন্তু কোথায় তিনি রাজত্ব করতেন সে সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। সাতবাহন ও কুষান উভয় সাম্রাজ্যের বেশ কিছু অংশ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও আয়তনের দিক থেকে তা মৌর্য সাম্রাজ্যের তুলনায় ছোট ছিল। হিন্দু সমাজ ব্যবস্থানুযায়ী, এই রাজবংশটি ক্ষত্রিয় ছিল কিনা, তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও অনেক ঐতিহাসিকগণ মনে করেন এরা বৈশ্য ছিলেন।এ যাবত প্রাপ্ত এদের মুদ্রা ও শিলালিপি থেকে অনুমান করা হয় যে, গুপ্তরাজারা উত্তর প্রদেশ থেকেই তাদের ক্ষমতা বিস্তার আরম্ভ করেন। পূর্ব ভারত ও উত্তর প্রদেশেই এঁরা রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা প্রভাবতী গুপ্তের তাম্র অনুশাসনে এই রাজাকে মহারাজ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সম্ভবত বংশের গৌরব প্রকাশের জন্য তিনি মহারাজ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। ২৮০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরে তাঁর পুত্র ঘটোৎকচা(Ghatotkacha)রাজা হন।

আর্টিকেল পড়তে ভাল লাগছে না তাহলে ভিডিও দেখুন

৬৭৫ খ্রিষ্টাব্দে চৈনিক পরিব্রাজক ইৎসিং ভারতবর্ষ ভ্রমণ করতে আসলে, তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, তার ভারত-ভ্রমণের প্রায় ২৫ বৎসর আগে, মহারাজা শ্রীগুপ্ত চৈনিক ধর্মযাজকের জন্য নালন্দার ২৪০ মাইল পূর্বে একটি ধর্মমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এটি চীনের মন্দির নামে পরিচিত। এ মন্দিরের ব্যয় সংকুলানের জন্য ২৪টি গ্রামও তিনি দান করেন। গঙ্গার গতিপথ ধরে নালন্দা হতে চল্লিশ যোজন দূরত্বে মুর্শিদাবাদের অবস্থান। এভাবে ই-ৎসিঙ্-এর বিবরণের দূরত্ব ও দিক বিচার করে প্রখ্যাত গাঙ্গুলী গুপ্তদের আদি বাসস্থান বাংলার মুর্শিদাবাদে ছিল বলে মন্তব্য করেন। তবে, হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী বলেন, উত্তর বঙ্গ বা বরেন্দ্র ছিল গুপ্ত রাজগণের মূল বাসস্থান। সুতরাং একথা বলা যেতে পারে যে, গুপ্তগণের আদি নিবাস ছিল খুব সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ অথবা উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রীতে; যদিও ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে এখনও মতৈক্যে পৌঁছুতে পারেননি। সত্য বলে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা যায় এমন কোনো সাক্ষ্য নেই বলে রায়চৌধুরী বা গাঙ্গুলীর তত্ত্ব ঐতিহাসিক মহলে সম্পূর্ণভাবে গৃহীত হয় নি।গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল পূর্ব-পশ্চিম বরাবর সৌরাষ্ট্র থেকে উত্তর বঙ্গ পর্যন্ত।
প্রাথমিক দিক থেকে শ্রীগুপ্তকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে রাজ্য গঠন করেছেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত । তিনি রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করে গাঙ্গেও উপত্যকায় নিজ প্রাধান্য স্থাপন করেন । তাঁর রাজ্য উত্তর প্রদেশের পূর্বাংশ, বিহার, এমনকি বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । মৃত্যুর পূর্বে তিনি পুত্র সমুদ্রগুপ্তকে নিজ উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করে যান ।
গুপ্ত রাজাদের মধ্যে সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন শ্রেষ্ঠ । শৌর্য-বীর্য, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সংস্কৃতির প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তিনি ভারত ইতিহাসে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন । তাঁর সিংহাসন আরোহণের সঠিক সময় বলা কঠিন । তিনি ৩২০ খ্রিস্টাব্দের পর সম্রাট পদে অভিষিক্ত হন বলে মনে করা হয়। তবে, ড. রোমিলা থাপারের মতে, তিনি ৩৩৫ সাল নাগাদ পিতৃ সিংহাসন লাভ করেন।সিংহাসনে বসার পরই সমুদ্রগুপ্ত রাজ্যবিস্তারে মনযোগ দেন । পূর্বেকার মৌর্য রাজা অশোকের শান্তি ও অহিংসা নীতি বর্জন করে তিনি সামরিক শক্তির সাহায্যে এক সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করেন। সভাকবি হরিষেণের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে তাঁর বিজয় কাহিনি জানতে পারা যায় । এই লিপিতে অনেক পরাজিত রাজার নামের উল্লেখ আছে । সমুদ্রগুপ্ত যে সব রাজ্য জয় করেছিলেন, তাদের মোটামুটি পাঁচভাগে ভাগ করা যেতে পারে।প্রথমভাগে রয়েছে গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী এলাকার রাজ্যগুলি । এই অঞ্চলের রাজাদের পরাজিত করে সমুদ্রগুপ্ত তাঁদের রাজ্য সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন ।দ্বিতীয়ভাগে পড়ে পূর্ব হিমালয়স্থিত রাজ্যগুলি এবং নেপাল, বঙ্গ, আসাম প্রভৃতি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের রাজ্যসমূহ । এখানকার রাজারা সমুদ্রগুপ্তের বাহুবলের পরিচয় পেয়েছিলেন । পাঞ্জাবের কয়েকটি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়।তৃতীয়ভাগে রয়েছে বিন্ধ্য অঞ্চলের অটবিক রাজ্যগুলি ।চতুর্থভাগে উল্লেখিত হয়েছে দক্ষিণ-ভারতে পরাজিত রাজারদের নাম। সবশেষে পঞ্চমভাগে শক ও কুষাণ রাজাদের নামের তালিকা ।
এই বংশের পতন ঘটেছিল ৫১০ খ্রিষ্টাব্দের পরে। তবে ঠিক কোন সময়ে গুপ্তরাজ্য সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছিল, তা জানা যায় নি। বলা হয়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্থানীয় প্রাদেশিক শাসক এবং হানদের আক্রমণে গুপ্তসাম্রাজ্য বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল যশোধর্মণের রাজ্য বিস্তার। গুপ্ত রাজ বংশের রাজা স্কন্ধগুপ্তের পর, পরবর্তী অযোগ্য শাসক এবং হুনদের ক্রমাগত আক্রমণের কারণে সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে স্কন্ধগুপ্ত হুনদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত হুনদের রাজা তোরমান গুপ্তরাজ্যের একটি অংশ দখল করতে সক্ষম হন। যদিও ভানুগুপ্ত নামক এক রাজার কাছে তোরমান পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু তারা হুনদের সম্পূর্ণ পরাস্ত করতে পারেন নি। এই সময় গুপ্তরাজ বংশের উত্তরাধিকারদের মধ্যে আত্মকলহের সুযোগে সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে একাধিক রাজবংশের উত্থান ঘটে। এহেন পরিস্থিতিতে হুনরা গান্ধার, পাঞ্জাব থেকে শুরু করে মালব পর্যন্ত দখল করে। এর পাশাপাশি দক্ষিণে বলভীর মৈত্রবংশ, থানেশ্বররের পুষ্যভূতি বংশ, কনৌজের মৌখরীবংশ এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলে দুটি শক্তিশালী রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এই রাজ্য দুটি হলো- স্বাধীন বঙ্গরাজ্য ও স্বাধীন গৌড়রাজ্য।
গুপ্ত শাসকদের শাসনামলে ভারতবর্ষের যে শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থাপিত হয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে দেশের বৈজ্ঞানিক ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ সক্ষম হয়।গুপ্তযুগকে বলা হয় ভারতের স্বর্ণযুগ,কেননা এই যুগ ছিল আবিষ্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ। বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত এই যুগেরই ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।গুপ্ত যুুগের আমলে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি যেমন কালিদাস, আর্যভট্ট, বরাহমিহির, বিষ্ণু শর্মা -এর অবির্ভাব হয়েছিলো।

ফাতিমা বিনতে মুস্তাফিজ ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )
সোর্স:
বাংলা পিডিয়া
ডেইলি হান্ট
অনুশীলন ডট অর্গানিজ্যাশন
বাংলাদেশের ইতিহাস (আদিপর্ব) -রমেশচন্দ্র মজুমদার।
ভারতের ইতিহাস -অতুলচন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button