ইতিহাসসাম্প্রতিক

রহস্যময় হারানো নগরী পেত্রার ইতিহাস

মানব সভ্যতার ইতিহাস উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করেছে। সভ্যতার ইতিহাস কখন থেকে শুরু হয়েছিল,এ কথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, সভ্যতার গতি কখনো স্থির থাকে নি। অগণিত জানা অজানা সভ্যতাকে পাড়ি দিয়েই, মানবজাতি আজকের পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। কালের আবর্তনে সৃষ্টি হয়েছিল বহু জানা না জানা নগরী,আবার তারই ধারাবাহিকতায় ধ্বংসও হয়েছে। কিন্তু তাদের ফেলে যাওয়া হাড্ডিসার, প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে আজো রহস্যের ন্যায় আমাদের মাঝে বিস্তার করে। পৃথিবীর ইতিহাসে, পেত্রা এমনই একটি রহস্যের নাম।
পেত্রা একটি প্রাচীন আরব নগরী। বর্তমান জর্দানের দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রাম ওয়াদি মুসা-র ঠিক পূর্বে হুর পাহাড়ের পাদদেশে এর অবস্থান। সুপ্রাচীন এই নগরীর অন্তরে লুকিয়ে আছে হাজারো ঐতিহাসিক নিদর্শন, যার মাত্র ১৫ শতাংশ ইতিহাসবিদগণ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর জন্য পেত্রা নগরী বিখ্যাত।
পেত্রা নগরীর নামকরণের সাথে গ্রিক শব্দ ‘পেত্রা’-র সাথে সাদৃশতা আছে। আরবিতে এ নগরটিকে আল্‌-বুত্রা বলা হয়ে থাকে যা পাথরের সমার্থক শব্দ।প্রকৃতপক্ষে নগরীর সীমানা ঘিরে থাকা লালচে পাথরশিলার বেষ্টনীর কারণে বাস্তবিক অর্থেই পেত্রাকে “পাথরের নগরী” বলা হয়ে থাকে। জর্ডান সাম্রাজ্যের অধীনে পেত্রার যাত্রা শুরু হলেও ৩য় শতাব্দীতে তা রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করা হয়।পেত্রা নগরীর প্রবেশদ্বার অত্যন্ত দুর্গম। এ নগরীতে প্রবেশ করতে হলে প্রায় ১ কিলোমিটারের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়।এই বিশাল স্থাপনা এতবছর আগে কিভাবে তৈরী করা হয়েছিল তা নিয়ে এখনো পরিপূর্ণ কোন ধারণা পাওয়া যায়নি।

একসময় নগরীটি অত্যন্ত সুন্দর সুরক্ষিত একটি দুর্গ ছিল। এর চারদিকের উচু পাহাড়ি দেয়াল, কিছুদুর পরপর বর্গাকার, গোলাকার উচু উচু স্তম্ভ, পাহাড়ের গায়ে খোঁদাই করা পাথুরে কারুকার্য, পাহাড় কেটে কেটে নিপুন ভাবে ১২ ফিট বা এর উচু রুমগুলো পেত্রাকে বিশ্বের মানুষের কাছে আজও রহস্যময় এবং বিখ্যাত করে রেখেছে। এক সময় এই নগরীর চারপাশের উচু পাহাড় গুলিতে প্রচুর পরিমানে ঝর্না ছিল, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যেগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে জানা যায়। গুহার পাশেই রয়েছে কঠিন পাথরের দেয়ালের গায়ে গ্রথিত সেই প্রাচীন দালানগুলো।যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত “খাজনেহ ফিরাউন” (khazneh faroun) নামের মন্দিরটি। মন্দিরটি ফারাওদের ধনভান্ডার নামেও পরিচিত। আরো রয়েছে একটি অর্ধগোলাকৃতির নাট্যশালা। যেখানে প্রায় ৩০০০ দর্শক একসাথে বসতে পারে।পেত্রার প্রাসাদের ভিতরে মোজাইক করা মেঝে দেখতে পাওয়া যায়, যা পঞ্চম শতকে ‘বাজেনটাইনদের’ আমলে করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ভৌগলিক ভাবে এর অবস্থান এবং চারপাশ পাহাড় দিয়ে ঘেরা দুর্ভেদ্য প্রবেশপথের কারণে পেত্রা নগরী ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং প্রাচীন পৃথিবীর বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।নগরীটির পশ্চিমের গাজা(gaza), উত্তরের বসরা (bosra)ও দামেস্ক(damask),লোহিত সাগরের পাশের অঞ্চলগুলির কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় সেকালে পেত্রা হয়ে উঠেছিল মরুভূমির উপর দিয়ে পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র বাণিজ্যিক পথ। খ্রিস্টপূর্ব ৩১২-তে আরব আদিবাসী নবতিয়ানরা (Nabataean)এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে এবং নবতিয়ান রাজা চতুর্থ এরাটাস পেত্রাকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ এটি নাবতাইন রাজ্যের রাজধানী ছিল। বাণিজ্য ব্যবস্থায় এই অঞ্চলে একক আধিপত্য থাকার খুব অল্প সময়েই পেত্রা প্রচুর সমৃদ্ধশালী নগরীতে পরিণত হয়। মূলত আরব ও রোমান লোকেরা তাদের ক্যরাভান নিয়ে যাবার সময় পেত্রাতে এসে থামত এবং এখান থেকে পানি সহ আরোও অন্যান্য জিনিস নিয়ে যেত ।
পেত্রার এই উন্নতি ক্রমেই অন্য দেশের সম্রাটদের নজরে কাড়তে থাকে। ১০৬ খ্রিটাব্দে রোমান সম্রাট ট্রোজান এর আদেশে রোমানরা পেত্রা দখল করে তা ‘আরব পেত্রাইয়া’ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করে।পরবর্তিতে রোমান শাসনের সময় রোমানরা সমুদ্র কেন্দ্রিক বাণিজ্য শুরু করলে পেত্রাদের আধিপত্য কমে যায়। একইসাথে অর্থনৈতিক ভাবে পেত্রারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে রোমানদের সমুদ্রপথে বাণিজ্য করাকে দায়ী করা হয়। মাত্র দুইশত বছরের মাথায় পেত্রা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত হয়। ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দে এক প্রলয়ংকারী ভূমিকম্পে পেত্রার সামগ্রিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অর্থনৈতিক মন্দার মুখে ব্যবসায়ীরা পেত্রা ত্যাগ করতে থাকে। ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে পেত্রা। পরবর্তীতে ৭০০ সালে মুসলিম শাসকরা পেত্রা দখল করে নেয়। এককালের সমৃদ্ধ নগরী পেত্রা ততদিনে রূপ নিয়েছে সামান্য গ্রামে। তাই পেত্রার প্রতি শাসকদের গুরুত্ব কম ছিল। প্রথম ক্রুসেডের সময় পেত্রা মুসলিমদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেন জেরুজালেমের রাজা প্রথম বালডউইন। ১২১৭ সালে মুসলিমরা পুনরায় পেত্রা জয় করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে মামলুক সুলতান বেবারের আমলে পেত্রা সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মানুষ পেত্রার নাম ভুলে যায়। ইতিহাসের পাতায় পেত্রা একটি রূপকথা হিসেবে টিকে থাকে। আরবের বেদুইনরা পেত্রার সঠিক অবস্থান জানলেও তা বাইরের মানুষদের নিকট প্রকাশ করতো না।
পেত্রার অধিবাসীদের মাঝে খুব একটা ধর্ম বিশ্বাস লক্ষ্য করা যায় না। তবে বিস্তর গবেষণার পর জানা যায়,নবতিয়ানরা আরব দেব দেবীদের পূজা করত। তারা দুশরা নামক এক দেবতার পূজা করত, সাথে তিন দেবী আল-উজ্জা, লাত এবং মানাতের পুজা করত। এসব দেব দেবীর অনেক মূর্তিই নগরীটির দেয়ালে খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া ও আরো কিছু গবেষণায় দেখা যায় তারা সূর্য দেবতারও পুজা করত।
ক্রুসেইড এর পর অনেক বছর পেত্রার কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। বহু বছর অজানা থাকার পর ১৮১২ সালে, এই প্রাচীন শহরটিকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে উন্মোচন করেন সুইস পরিব্রাজক জোহান লুডিগ বুর্খার্দত(Johann Ludwig Burckhardt)।পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে ‘বৈশ্বিক ঐতিহ্যবাহী স্থান’ ঘোষণা করে।এ ঘোষণায় বলা হয়, পেত্রা সংস্কৃতি, সম্পদ আর ক্ষমতায় একসময় যে কত সমৃদ্ধ ছিল তা প্রমাণ করতে পেত্রার ধ্বংসাবশেষই যথেষ্ট। এছাড়াও ২০০৭-এ পৃথিবীর নতুন সাতটি সপ্তাশ্চযের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে পেত্রা। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১ মিলিয়ন এর মত ট্যুরিস্ট এই ঐতিহ্যবাহী নগরীটিতে ঘুরতে যেয়ে থাকে। জোহান বুর্কহার্ট-এর আবিষ্কৃত পেত্রাকে ঘিরে আজও ইতিহাসবিদগণের আগ্রহ শেষ হয়নি। পেত্রাকে নিয়ে ঘিরে থাকা রহস্যের উন্মোচনের প্রত্যাশায়,আজো পেত্রার বুকে যে হাজারো গবেষক রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন,তাদের কর্ম সফলতার আলোয় আলোকিত হোক।

ফাতিমা বিনতে মুস্তাফিজ ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )
সোর্স:
উইকিপিডিয়া
Roar বাংলা
ইতিবৃত্ত
আয়না24
ফ্যাক্টস বিডি
বাংলা রিডার

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button