জীবনীসাম্প্রতিক

ইরানের শাহেনশাহ খ্যাত নাদের শাহের জীবনী

নাদের শাহ। ইতিহাসে যিনি নাদের কুলি বেগ হিসেবেও পরিচিত।  তিনি ছিলেন আফছারিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইরানের শাহ হিসেবে শাসন করেছেন । তার প্রখর সামরিক দক্ষতার কারণে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ তাকে পারস্যের নেপোলিয়ন, পারস্যের তলোয়ার বা দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
১৬৯৮ সালের ৬ আগস্ট মতান্তরে ১৬৬৮ সালের ২২ নভেম্বর দস্তগীর দুর্গনগরে আফছারের কেরেক্লু গোত্রে নাদের শাহের  জন্ম। তার পিতা এমাম কুলি পেশায় একজন গবাদিপশু পালক। মাঝে মাঝে কোটম্যাকার ও উষ্ট্রচালক হিসেবেও কাজ করতেন। বাল্যকালেই নাদের শাহের পিতা এমাম কুলির প্রাণবিয়োগ ঘটে। পিতার মৃত্যুর পর নাদের এবং তার মাতা উজবেক বা তুর্কিদের দাস হিসেবে কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে নাদের শাহ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে এর প্রধান হয়ে উঠেন।পরিণত বয়সে নাদের শাহ স্থানীয় গোত্রপ্রধান বাবা আলী বেগের দুই কন্যাকে বিয়ে করেন।ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ইরানী শাসকদের মধ্যে তিনি একজন। নাদের শাহ তুর্কির আফছার উপজাতির সদস্য ছিলেন। এই আফছার উপজাতিই প্রথম শাহ ইসমাইলের সময় থেকেই সাফাভিদ রাষ্ট্রে সামরিক রসদ সরবরাহ করতেন।তিনি শুধুমাত্র একজন যােদ্ধা বা কোন বর্বর দলের বর্বর নেতা ছিলেন না, বরং সুনিপুণ অস্ত্রধারীর ন্যায় কূটনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় একজন দক্ষ লােক ছিলেন।
 ১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের সফভি বংশিয় শাহ তামাস্পকে সিংহাসনচ্যুত করে নাদির শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু নীল রক্ত নেই বলে পারস্যের অভিজাতরা তাকে সম্রাট হিসেবে মানতে নারাজ ছিল। তিনি ক্ষমতায় আসার পর পারস্যের অঞ্চলগুলোকে পুনরায় একত্রিত করেন ও সেখান থেকে দখলদারীদের উচ্ছেদ করেন। হাটকাই পশতুনদের বিদ্রোহের পর ইরানের বিশৃঙ্খলার সময় নাদের শাহ ক্ষমতা দখল করে দুর্বল শাহ সুলতান হুসেনকে পরাজিত করে, যখন সাফাজিদের আর্ক-শত্রু, অটোমানরা এবং রাশিয়ানরা নিজেদের জন্য পারসিয়ান এলাকা দখল করে নিয়েছিল।  তিনি এত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন যে ২০০ বছর ধরে পারস্য শাসন করা সাফাভিদ রাজবংশের শেষ শাসককে পদচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন। ১৭৩৬ সালে সাফাভিদ রাজবংশের শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেকে ইরানের শাহ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বহু দেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করলেও তার সেনাবাহিনী পারস্যের অর্থনীতিতে ধ্বংস ডেকে আনে।

নাদের শাহ সেনাবাহিনী | Image Source- Pinterest

বহুদিন থেকেই ইরানের কান্দাহার প্রদেশে আফগান উপজাতিদের বসবাস ছিল। ১৭৩৮ সালে তিনি কান্দাহার আক্রমণ করে স্থানীয় বিদ্রোহী আফগান উপজাতিগুলিকে তাড়াতে সক্ষম হন। ইরান থেকে এসে এই বিক্ষুব্ধ আফগান জাতি আশ্রয় নেয় ভারতে।বিদ্রোহী আফগান উপজাতিগুলি ভারতে আশ্রয় নিলে, নাদির শাহ মুঘল সরকারের নিকট বার্তা পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানান। কিন্তু তাতে কোন কাজ হলো না। আফগানরা ভারতে বসবাস করা শুরু করল। তারই ধারাবাহিকতায় নাদির শাহ ভারত আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন।
নাদির শাহের ভারত আক্রমণের মূল কারণ ছিল কান্দাহার থেকে পালিয়ে আসা ভারতে অবস্থানকারী বিদ্রোহী আফগানদের দমন করা। এছাড়াও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেও তিনি ভারত আক্রমণ করার মনস্থির করেন। মারাঠাদের দমন করে মুঘল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করাও ছিল তার উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিকদের মতে, অযােধ্যার সুবাদার সাদাত খান এবং দক্ষিণের সুবাদার নিজাম-উল-মুলক, নাদির শাহকে ভারত আক্রমণের জন্যে প্ররােচনা দেন।  মূলতঃ ভারতের ঐশ্বর্যের হাতছানি নাদির শাহকে ভারত আক্রমণে প্রলুব্ধ করে।
১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারত অভিযান শুরু করেন। কাবুল ও গজনী দখল করে নাদির শাহ পাঞ্জাবে চলে আসেন। পেশোয়া ও লাহোর দখল করলে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ পাঞ্জাবের কর্ণালে নাদির শাহকে বাধা দেন। মুহাম্মদ শাহ ও নাদির শাহের মধ্যে কর্ণালের প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধ বাঁধে। কর্ণাল দিল্লি থেকে ১১০ কি মি উত্তরে হরিয়ানা প্রদেশে অবস্থিত। মুহাম্মদ শাহের ছিল ৩ লক্ষ্য সৈন্য, ২ হাজার হস্তি ও ৮ হাজার কামান। অপরদিকে নাদির শাহের ছিল ৫৫ হাজার সৈন্য। পারস্যদের আক্রমণ ছিল সংগঠিত। অপরদিকে মুঘলরা ছিল অগোছালো।  যুদ্ধে নাদিরের হাতে মুঘল বাহিনীর শােচনীয় পরাজয় ঘটে। মহম্মদ শাহ নাদিরের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।  এ যুদ্ধে ২০-৩০ হাজার মুঘল সৈন্য ও ২৫০০ পারস্য সৈন্যের প্রাণহানি ঘটে। 
সম্রাট মহম্মদ শাহকে সঙ্গে নিয়ে নাদির শাহ দিল্লীতে ঢুকে পড়েন। দিল্লীর অধিবাসীরা নাদিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় নাদিরের সেনাদল বহু সংখ্যক দিল্লী বাসীকে হত্যা করে এবং বহু গৃহ লুঠ করা হয়। নারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালান হয়। ৬ ঘন্টায় পারস্য সৈন্যরা ২০-৩০ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যা করে।  দিল্লীর অধিবাসীদের ওপর দুই কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করেন নাদির শাহ। মুহাম্মদ শাহ দিল্লির রাজকোষের চাবি নাদির শাহের হাতে তুলে দেন। দিল্লী ছাড়ার আগে তিনি ময়ূর সিংহাসন, কোহিনুর মণি, প্রচুর মণি-মাণিক্য, অসংখ্য হাতী, ঘােড়া, উট ও গবাদি পশু, দক্ষ কারিগর ও দাস-দাসী উপঢৌকন বাবদ নিয়ে যান। সাথে নিয়ে যান মুঘলদের অহংকার। ভারতবর্ষের ২০০ বছরের সম্পদ চলে গেল পারস্যে। ১৭৩৯ সালের মে মাসে নাদির শাহ তার দলবল নিয়ে দিল্লী ত্যাগ করেন। ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে যাওয়া সম্পদে পারস্য ধন-দৌলতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে নাদির শাহ পারস্যে ৩ বছর পর্যন্ত কর আরোপ বন্দ করে দেন।
নাদিরের আক্রমনের ফলে মুঘলদের মর্যাদা ধুলায় মিশে যায়।দিল্লীর প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে।কিছুদিনের জন্যে দরবারের অভিজাতরা হতবুদ্ধি হয়ে যান।নাদিরের শােষণে ক্ষতিগ্রস্ত অভিজাতরা তাদের ক্ষতিপূরণ পূরণের জন্যে জায়গীরগুলির ওপর প্রচণ্ড শােষণ চালান।ভারতে যে সকল ইরাণী ও তুরাণী গােষ্ঠীর লােক ছিল তারা ভারতীয় চরিত্র গ্রহণ করে ভারতীয় জনগােষ্ঠীতে মিশে যায়। 
নাদের শাহ তার আদর্শ হিসেবে এশিয়ার দুই বিজেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লংকে অনুসরণ করতেন।পরবর্তীকালে তাদের মতো নিষ্ঠুরও হয়ে ওঠেন। ১৭৪৭ সালে তাকে হত্যার পরপরই নাদিরের সাম্রাজ্য ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। পারস্যের এই কিংবদন্তি সম্রাটকে এশিয়ার ইতিহাসের সর্বশেষ মহান সামরিক বিজেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মোহাম্মদ আজাদ হোসাইন ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর এএফবি ডেইলি )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button