সাম্প্রতিকপ্রযুক্তি

কোয়ান্টাম কম্পিউটার যা বদলে দিবে পৃথিবীর ইতিহাস

সে অনেক কাল আগে মানুষ যখন প্রথম আগুন জ্বালাতে শিখলো তখন এক সভ্যতার স্তর আরেক সভ্যতার স্তরে সে উপনীত হতে পারছিলো । এরপরে মানব সভ্যতার যাত্রায় বেশ কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে যা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বহুদূর । সাম্প্রতিক সময়ের কথা বলতে গেলেও গত বিংশশতাব্দীতে বেশ কিছু আবিষ্কার আমাদের এই নতুন যুগের চলার পথ কে করেছে গতিময় ।
সময়ের সাথে চলতে গিয়ে মানুষ দেখলো হিসাব নিকাশ এর জন্য কিছু একটা যান্ত্রিক উপায় তৈরি করা দরকার যাতে অল্প সময়েই অনেক বড় গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা যায় ।
ধারনা খুব সহজ ছিলো আর সেই থেকেই ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে আজকের কম্পিউটার জিনিসটা এসেছে । কম্পিউটার যন্ত্রের ব্যাপকতা আজ এমন এক পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছে বিশাল সব হিবাব নিকাশ থেকে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান ই করা সম্ভব অল্প সময়ে ।
কিন্তু মানুষের সহজাত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এগিয়ে চলা । সেই এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন এক ধরনের কম্পিউটার আবিষ্কার এর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে ।। সেই মহাক্ষমতাধর যন্ত্র টি হচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার বলতে এমন এক ধরনের কম্পিউটারের কথা আমাদের মনে আসবে যেটা এখনকার ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের থেকে হাজার গুণ দ্রুত জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান এক নিমিষেই করে ফেলতে পারবে । যেটা করতে এখনকার সুপার কম্পিউটারের হাজার বছর লেগে যেত ।
এখনকার সব থেকে উন্নত সুপারকম্পিউটার যে গাণিতিক হিসাব করতে দশ হাজার বছর লাগবে সেই হিসাব কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে বড়জোর তিন থেকে পাচ মিনিটে করে ফেলা সম্ভব ।
ক্লাসিকাল কম্পিউটার মাউস মনিটর সিপিউ ইত্যাদি নিয়ে হয়ে থাকে কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার এর ধরন ভিন্ন আকৃতির হতে পারে বা হবে । সাম্প্রতিক সময়ে গুগল এর দাবী করা কোয়ান্টাম কম্পিউটার দেখতে উল্টা করে ঝুলানো কেকের মতন , যাতে রয়েছে অসংখ্য সিলিন্ডার আর নিচের দিকে রয়েছে কালো চিপ ।

এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার জিনিসটা আসলে কেমন করে কাজ করে এটার বুঝার আগে জানতে হবে আসলে এই কোয়ান্টাম জিনিসটা দ্বারা কি বুঝায় । কোয়ান্টাম তত্ত্ব হলো পদার্থবিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে পরমাণু এবং পরমাণুর মধ্যে অবস্থিত ক্ষুদ্রতর কণা নিয়ে আলোচনা করা হয় । মহাবিশ্বের সকল বস্তুই ক্ষুদ্র কণা নিয়ে গঠিন যা কোয়ান্টাম তত্ত্ব বিস্তারিত জানায় ।
ব্যাপারটা হচ্ছে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার লজিক অস্বীকার করে । কোয়ান্টামের জগতে পরমাণু প্রচলিত পদার্থবিদ্যার সূত্র মানে না । কোয়ান্টাম কণা একই সময়ে সামনে বা পিছনে যেতে পারে , একই সময়ে দুই জায়গায় অবস্থান করতে পারে ।
অর্থাৎ একটি কোয়ান্টাম কণা বা পারমাণবিক মাত্রার একটি কণা একই সঙ্গে তার সব রকম অবস্থায় থাকতে পারে । এই অদ্ভুতুড়ে আচরণের কারনে কোয়ান্টাম ব্যাপার টা অন্য সব কিছুর থেকে ভিন্ন কিন্তু সত্য ।

ভিডিওতে দেখুন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ইতিহাস

ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটার চলে বিটের হিসাবে। যা বাইনারি পদ্ধতিতে ০ ও ১ এই দুইটা সংখ্যা কে প্রতিনিধিত্ব করে । অর্থাৎ প্রতিবার ০ অথবা ১ ব্যবহার করতে পারে তথ্য সংরক্ষনের জন্য । এটা বিট হিসাবে তথ্য সংরক্ষন করে থাকে । আটটা বিট মিলে একটা বাইট হয় যা একটি সংকেত কে সংরক্ষন করে ।
কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিউবিটের হিসাবে চলে । এটিও ০-১ বাইনারীকে ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষনের জন্য কিন্তু এটা করে ভিন্ন ভাবে । অনেকটা কোয়ান্টাম তত্ত্বে বর্ণিত পদার্থে কণার ধর্মের মতন ।
যেমনটা কোয়ান্টাম জগতে কণা একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় থাকতে পারে ঠিক তেমনি ভাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে বাইনারী সংখ্যা ০ ও ১ এই দুটি একই সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করে একই সঙ্গে কাজ করে দ্রুত সময়ে বহু তথ্য সংরক্ষন করতে পারে ।
এটি তথ্য সংরক্ষন দিগুণ নয় বহুগুনে করবে। এটা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে । যেমন দুই কিউবিটে যদি চারটি সংখ্যা সংরক্ষণ করা যায় তবে তিন কিউবিটে আটটি আর চার কিউবিটে পারবে ১৬ টি সংখ্যা সংরক্ষণ করতে ।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার মুহূর্তেই অতি দ্রুত জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে যা প্রচলিত কম্পিউটার করতে পারবে না । প্রচলিত কম্পিউটার ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহার করে এনক্রিপশন ভাবে নিরাপদে তথ্য জমা করি কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তুড়ি মিরেই সেই সব নিরাপদ এনক্রিপশন ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব ।
তবে সহসাই প্রচলিত কম্পিউটারের জায়গা দখল করতে পারবে না কারন কোয়ান্টাম কম্পিউটার এর কাজ আর প্রচলিত কম্পিউটারের কাজের মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির লক্ষ্যই হচ্ছে ভিন্ন প্রচলিত কম্পিউটার থেকে । তবে এটা সত্য যে প্রচলিত কম্পিউটার জগত কে তুড়ি মেরেই তাসের ঘরের মতন ভেঙ্গে ফেলা যাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে ।

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের উদ্দেশ্য হচ্ছে অতি জটিল হিসাব কে অতি দ্রুত করে ফেলা যাতে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত করা যায় । মহাকাশ বিজ্ঞানে এর ব্যবহার করা যাবে জটিল হিসাবের জন্য ।
বিশাল সংখ্যার ডেটা বিশ্লেশন করা যাবে খুব সহজেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে । নতুন ও টেকসই সামগ্রী তৈরি তে ভূমিকা রাখবে । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখা যাবে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে ।
জটিল রোগের অষুধ তৈরিতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করবে । বিশাল বিমানবন্দরের ট্রাফিকিং সিস্টেম নিখুত ভাবে নিয়ন্ত্রন করা যাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এর মাধ্যমে ।
আসলে উদ্দেশ ব্যাপারটা নির্ভর করে এটা ব্যবহার কে করবে বা করছে । ভালো খারাপ দুই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যায় যা ব্যক্তি প্রতিষ্টান দেশ এর উপর নিভর করে ।

যখন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠান বা দেশ ঐ সব জটিল সমস্যার সমাধান অত্যন্ত কম সময়ে করতে পারবে তখনই বলা হবে যে তারা কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি অর্জন করছে । সাম্প্রতিক সময়ে বলা হচ্ছে গুগল কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি অর্জন করছে । তাদের তৈরি সেকামোর কোয়ান্টাম প্রসেসর ব্যবহার করে যে গাণিতিক সমস্যার সমাধান ২০০ সেকেন্ডে করছে তা করতে সুপার কম্পিউটারের দশ হাজার বছর লেগে যাবে ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং করতে সক্ষম সেকামোর চিপটিতে রয়েছে ৫৩ কিউবিটস । যা প্রথাগত কম্পিউটার বিটসের চেয়ে বহুগুন বেশি কাজ করতে পারে এই কিউবিটস ।
তবে অন্য অনেকেই গুগলের কোয়ান্টাম সুপ্রেমেসি নিয়ে প্রশ্ন এবং সন্দেহ প্রকাশ করছে ।। আইবিএম তো গুগলের দাবী করা কোয়ান্টাম সুপ্রেমেসির ব্যাপারে আপত্তিও তুলেছে ।
বেশ কয়েক বছর ধরেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি চেষ্টা চলছে । টেক জায়ান্ট গুগল ছাড়াও মাইক্রোসফট , আইবিএম , অ্যামাজান সহ চীন, ইউরোপ , যুক্তরাজ্য এবং আলিবাবা, হুয়াওয়ে মতন প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি লক্ষ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতাছে । যে পক্ষ সবার আগে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মালিক হবে , সেই পক্ষই অসীম ক্ষমতার অধিকারী হবে ।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার এর ক্ষমতা অনেক এর মাধ্যমে ক্ষতির ব্যাপারটাও বিশাল ।
এর ভয়াবহতা নির্ভর করবে খারাপ ব্যবহার এর উপর । ভুল মানুষ বা প্রতিষ্টানের হাতে পড়লে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়ে দাঁড়াবে সীমাহীন ক্ষতির কারন ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার হালের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে তাসের ঘরের মতন ভেঙ্গে ফেলতে পারবে । বেহাত হয়ে যেতে পারে সকল ব্যক্তিগত, রাষ্টীয় গোপনীয় তথ্য সমূহ । ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধস নামবে খারাপ ব্যবহারের ফলে । হ্যাকারা ব্যবহার করে আর্থিক ক্ষতির সাধন করতে পারবে ।

 কোয়ান্টাম কম্পিউটারের আরেক ভয়াবহ দিক হচ্ছে যদি এইটা দমনমূলক রাষ্টের হাতে পড়ে তাহলে সেই দেশের জনগনের জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারবে । কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে উচ্ছ্বাসের সাথে এর ভয়াবহতার কথা ভাবলে মনে হতেই পারে ছেড়ে দে মা কেদে বাচি ।

পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনি পাওয়া যাবে না । এর জন্য হয়তো আরো ১০-১৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে । তবে এটা বলায় যায় আগামী তে রাজত্ব করতে আসবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার । বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের এগিয়ে আসাকে তরান্বিত করবে ।

সেই অনেক কাল আগে যখন আগুন ব্যবহার করতে শিখে মানুষ আধুনিকতার দিকে পা দিয়েছিলো তার যাত্রায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার একটা ধাপ হবে যা তাকে নিয়ে যাবে আরো সামনে ।

মানুষ বড়ই বিচিত্র প্রানী । জ্ঞান বিজ্ঞানের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার যেমন একটা মাধ্যম হবে তেমনি এর ব্যবহার এর কুফলতা ধ্বংসের কারনও হতে পারে তবুও আমরা একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ এর স্বপ্ন দেখবো । যেখানে জীবন ব্যবস্থা অনেক সহজ হবে । যন্ত্র মানুষের বন্ধুর মতন এসে পাশে দাঁড়াবে ।

Writer – Rony khan Ron


Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button