ইতিহাসসাম্প্রতিক

ঐতিহাসিক সিফফিনের যুদ্ধের ইতিহাস | হযরত আলী রাঃ বনাম মুয়াবিয়া রাঃ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ

পৃথিবীতে একটি সময় ছিল যখন সমগ্র মুসলিম জাতি একই কাতারে সামিল ছিল। তখন ছিল না কোনো মতভেদ,রেষানোল বা আন্তদল। কিন্তু, সব কিছু পাল্টে যায়, যখন নিজ গৃহে, শত্রুদের হাতে খলিফা হজরত উসমান(রা:) শাহাদাত বরণ করেন। এতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যে ফাঁটল ধরে যায় এবং বিশৃঙ্খলা ধেয়ে আসে। প্রিয় খলিফার হত্যাকাণ্ডে ক্রোধান্বিত হয়ে,বিভ্রান্তির ছলনে,ঘটে যায় বহু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ঐতিহাসিক সিফফিনের যুদ্ধ তারই উদাহরণ।
সিফফিনের যুদ্ধ বা জঙ্গে সিফফিন,৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে,হিজরি ৩৭ সনে ঘটে যাওয়া, একটি বিভীষিকাময় গৃহযুদ্ধ। উষ্ট্রের যুদ্ধের পর, এটি ছিল মুসলিম ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গৃহযুদ্ধ। ইউফ্রেটিস তথা ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে সিফফিন নামক প্রান্তরে তৎকালীন চতুর্থ ও সর্বশেষ খোলাফায়ে রাশেদীন হজরত আলী(রা:) ও সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা:) এর মধ্যে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। যুদ্ধে দু পক্ষেই রাসূলের(স:) সর্বাধিক অনুগত সাহাবীগণ বিদ্যমান ছিলেন।
উষ্ট্রের যুদ্ধের পর, মক্কা,মদিনা,ইরাক ও মিশরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও, কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য দিনকে দিন ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এরকম পরিস্থিতিতে কুফায় রাজধানী স্থানান্তর এবং প্রশাসনিক রদবদল দ্বারা খলিফা আলী(রা:) স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তিনি মুসলিম রাজ্যের স্থিতিশীলতা আনয়নে অধিক অগ্রাধিকার দেন এবং উসমান (রা:)র হত্যাকারীদের বিচার করার জন্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করেন। কিন্তু এতে মুয়াবিয়া (রা:) বেঁকে বসেন। তিনি মনে করেন, আলী (রা:) ইচ্ছা করেই উসমান (রা:)র হত্যাকাণ্ডের বিচার মুতলবি করেছেন। তাই তিনি সম্পূর্ন খলিফার বিরুদ্ধে চলে যান। এমনকি, মুয়াবিয়া (রা:) সিরিয়ায় নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং জনগণের বায়াত গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় হযরত আলী (আ.) ও মুয়াবিয়ার মধ্যে কয়েক দফা পত্র বিনিময় হয়। আমিরুল মুমিনিন বেশ কয়েকবার সিরিয়ায় প্রতিনিধি পাঠান। তিনি একটি পত্রে মুয়াবিয়া (রা:) কে ইসলামের স্বার্থে তার আনুগত্য স্বীকারের আহব্বান জানান। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা:) চক্রান্তের আশ্রয় নিয়ে খলিফার আদেশ অমান্য করেন।তিনি ঘোষণা করেন যে, উসমান (রা:)র হত্যাকারীদের বিচার না হলে তিনি খলিফার আনুগত্য স্বীকার করবেন না। উপরন্তু, তিনি শাহাদাৎ বরণকৃত খলিফা উসমান (রা:) র রক্তে রঞ্জিত পোষাক ও তাঁর স্ত্রী নায়লার কর্তিত আঙ্গুল জনসম্মুখে প্রদর্শন করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে থাকেন।
মুসলমানদেরকে একটি ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে হযরত আলীর (রা:) প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় এবং সিফফিনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। মুয়াবিয়া (রা:) এর আচরণে ব্যথিত হয়ে,আলী (রা:) মালিক ইবনে হাবিব আল- ইয়ারবুইকে নুখায়লাহ উপত্যকায় সৈন্য সমাবেশ করার আদেশ দিলেন, যাতে মুয়াবিয়া (রাঃ) কে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যায়। ফলে কুফার উপকণ্ঠে প্রায় ৮০,০০০ মুসলিম জড়ো হয়। প্রথমে হযরত আলী (রাঃ) জিয়াদ ইবনে নদর আল-হারিছির নেতৃত্বে ৮,০০০ এবং সুরাহ ইবনে আল- হারিছির নেতৃত্বে ৪,০০০ সৈন্যের শক্তিশালী বাহিনী সিরিয়া আভিমুখে প্রেরণ করেন। এরপর অবশিষ্ট সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব নিজে গ্রহণ করে ৫ শাওয়াল বুধবার হযরত আলী (রাঃ) সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন।এদিকে মুয়াবিয়া (রাঃ)১২০,০০০ সংখ্যক সৈন্য সহ পূর্বেই সিফফিন পৌছে ছাউনি স্থাপন করেন এবং ফোরাত কূল অবরোধ করেন। হযরত আলী (রাঃ) সেখানে পৌঁছে মুয়াবিয়া (রা:) কে অনুরোধ করে পাঠালেন যেন তিনি ফোরাত কূল থেকে সৈন্য সরিয়ে পানি নেয়ার ব্যবস্থা অবরোধমুক্ত করেন। কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে, হযরত আলী (রাঃ) এর সৈন্যগন সাহসিকতার সাথে আক্রমণ করে ফরাত কূল দখল করে। তারপর হযরত আলী (রাঃ) মুয়াবিয়া(রা:)র কাছে বশীর ইবনে আমর আল-আনসারি, সাইদ ইবনে কায়েস আল-হামদানি ও শাবাছ ইবনে আত-তামিমীকে প্রেরণ করেন এ জন্য যে, তারা যেন যুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে বুঝিয়ে বলে এবং তিনি যেন বায়াত গ্রহণ করে একটি মীমাংসায় আসতে রাজি হন। এ প্রস্তাব মুয়াবিয়া (রাঃ)সরাসরি নাকচ করেন এবং উসমান (রা:)র রক্তের প্রতি তিনি উদাসীন থাকতে পারেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।কাজেই তরবারিই একমাত্র মীমাংসা ও এর কোন বিকল্প নেই। ফলে ৩৬ হিজরির জিলহজ মাসে উভয় পক্ষের যোদ্ধারা একে অপরের মোকাবেলা করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়ে।
আলী (রাঃ) পক্ষ থেকে অশ্বারোহীগণের সেনাপতি হিসেবে মালিক আশতার ও পদাতিক বাহিনির সেনাপতির পদে আম্মার ইবনে ইয়াসির নিযুক্ত ছিলোনা। অপরদিকে, মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে অশ্বারোহীগণের সেনাপতি ছিলেন সহল হুনায়েক ও পদাতিকের সেনাপতি ছিলেন কায়েস ইবনে সাদ। হাসিম ইবনে উতবাহ আলী (রা:)র ঝাণ্ডা বহনকারী ছিলেন। জিলহজ মাসের শেষে যুদ্ধ, মুহরামের জন্য যুদ্ধ ১ মাস বন্ধ থাকার পর ১ সফর আবার যুদ্ধ শুরু হল। দুপক্ষই একে অপরের উপর ঝাপিয়ে পড়লো।ভয়ানক যুদ্ধে দৃপ্তপদে ও বীর বিক্রমে উভয় পক্ষ যুদ্ধ করতে লাগলো। যুদ্ধের মাঝা মাঝিতে আলী (রাঃ) এর পদাতিক বাহিনির সেনাপতি হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার শত্রু সৈন্যের সারির মধ্যে প্রবেশ করেন এবং একের পর এক আক্রমণ রচনা করে তাদের মোকাবেলা করেন।কিন্তু এক পর্যায়ে একাধিক সৈন্য তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং আবু আল- যুহরী নামক এক সৈন্য তাঁকে আঘাত করেন। আঘাতের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তিনি ছাউনিতে ফিরে গেলেন এবং কিছুক্ষন পর ইন্তেকাল করেন।এদিকে আম্মারের মৃত্যুতে মুয়াবিয়ার বাহিনীর মাঝে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।যুদ্ধের পূর্বে তাদের মনে ধারণা দেয়া হয়েছিল যে, তারা ন্যায়ের জন্য হযরত আলী (রাঃ)এর বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু আম্মারের মৃত্যুতে তাদের ভুল ভেঙ্গে যায়। এ চিন্তা অফিসার হতে শুরু করে সাধারন সৈনিক সবার মনে আলোড়ন তৈরি করে। যুদ্ধের অষ্টম দিনে হযরত আলী (রাঃ) নিজেই ময়দানে গেলেন এবং এমন প্রচণ্ড বেগে আক্রমণ করেন যে যুদ্ধক্ষেত্র কম্পিত হয়ে উঠে। বর্শা ও তীরবৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি শত্রুর উভয় লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মুয়াবিয়াকে সরাসরি যুদ্ধ করার চ্যালেঞ্জ করেন। কিন্তু মুয়াবিয়া(রা:) এ চ্যালেঞ্জে পিছু হাঁটেন। মুয়াবিয়া(রা:)কে পিছনে হাটতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) মুচকি হেসে ফিরে গেলেন।
যে সাহসিকতার সাথে হযরত আলী (রাঃ) সিফফিনে আক্রমণ রচনা করেছিলেন তা নিঃসন্দেহে অলৌকিক।যুদ্ধের নবম দিন রাত ঘনিয়ে আশা পর্যন্ত প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল।এ রাত ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর, যা ইতিহাসে “আল- হারিরের রাত্রি” বলে খ্যাত। রাতে অস্ত্রের ঝনঝনানি, ঘোড়ার খুরের শব্দ ও মুয়াবিয়ার সৈন্যদের আর্তনাদে আকাশ প্রকম্পিত হয়েছিল। সকাল বেলায় দেখা গেল ৩০,০০০ উর্ধে মুসলিম শহীদ হয়েছে। দশম দিনে হযরত আলী (রাঃ)এর সৈন্যগন একই মনোবল নিয়ে যুদ্ধে গেল। সেদিন দক্ষিণ বাম বাহুর দলনেতা ছিলেন মালিক আল-আসতার এবং বাম বাহুর নেতা ছিলেন আব্বাস। তারা এমন তীব্র বেগে আক্রমণ রচনা করেছিলেন যে, মুয়াবিয়ার সৈন্যরা পালাতে শুরু করে।অবস্থা বেগতিক দেখে চতুর আমর বিন আস (রা:)এর পরামর্শে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) বর্শার মাথায় পবিত্র কুরআনের পৃষ্ঠা গেথে চিৎকার করে ঘোষোনা দিতে থাকেন যে উভয়ের মাঝে হকের ফয়ছালা কুরআন করবে এবং উভয় পক্ষই সেই ফয়সালা মেনে নিবে। আমর বিন আ’স(রা:)র এই কূটকৌশলে কাজ হল। কুরানের অমর্যাদা হবে এই ভয়ে আলীর সৈন্যরা আর যুদ্ধ করতে চাইলনা। হযরত আলী সৈন্যদের মুয়াবিয়া(রা:) এহেন প্রস্তাবকে রাজনৈতিক চাল বলে বুঝানোর চেষ্টা করেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সৈন্যরা কিছুতেই আর যুদ্ধ করতে চাইলনা।অগত্যা উপায়ন্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে আলী(রা:) মীমাংসার জন্য সায় দেন এবং যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা করেন।
উভয় পক্ষ সিফফিনের যুদ্ধে তিন মাস বিশ দিন অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে পরস্পরের মাঝে ৯০টি সংঘর্ষ হয়েছিল। এ আত্তঘাতী যুদ্ধে হযরত আলী (রাঃ) এর বাহিনীর ২৫ হাজার এবং মুয়াবিয়া (রাঃ) এর দলের ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মুসলমান সিফফিনের যুদ্ধে শাহাদাত বরন করেন। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হল যে, হযরত আলী (রাঃ) এর পক্ষ হতে একজন ও মুয়াবিয়া (রাঃ) এর পক্ষ হতে একজন সালিশ প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে একটি সুষ্ঠ সমাধান বের করবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক হযরত আলী (রাঃ) এর পক্ষ হতে হযরত আবু মুসা আল-আশয়ারী(রাঃ) এবং মুয়াবিয়া (রাঃ) এর পক্ষ হতে ধূর্ত আমর ইবনুল আস(রা:)কে নিযুক্ত করা হল। চুক্তি মোতাবেক উভয়েই “আজরুহ” অর্থাৎ দুমাতুল জন্দলে ৪০০ জন সাথী সহকারে মিলিত হলেন।ইতিহাসে এ মীমাংসা সভাকেই ঐতিহাসিক “দুমাতুল জন্দল মীমাংসা” বলা হয়ে থাকে।
সিফফিনের যুদ্ধ মুসলিম ইতিহাসের জন্য একটি বিভীষিকাময় অধ্যায়। এ যুদ্ধে যে পরিমান মুসলিম রক্ত ঝরেছে তা কখনোই পরিশোধ করা যাবে না। কিন্তু এত সংঘর্ষের পরও আলী(রা:) ও মুয়াবিয়া(রা:) র সম্পর্ক ভালো হয় নি। বরং দিনকে দিন তা ভঙ্গুরের দিকে ধাবিত হয়। যার ফলে, পৃথিবীকে দেখতে হয় মুসলমানদের করুণ পরিণতি।

ফাতিমা বিনতে মুস্তাফিজ ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily )

সোর্স:
উইকিপিডিয়া
বাংলাদেশ ইসলামিক মিডিয়া
ইসলামের ইতিহাস- মুহাম্মাদ আনোয়ার মাহমুদ
ব্রিটানিককা

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button