ইতিহাস
Trending

১৯১৮ সালের স্প্যানিশ-ফ্লুতে শুধু মাত্র ভারতে মারা গিয়েছিল ২ কোটি মানুষ ২০২০ সালে কি হবে ?

১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু
আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু পৃথিবীর বুকে হানা দিয়েছিল। স্প্যানিশ ফ্লু যা ১৯১৮ ফ্লু মহামারী হিসেবেও পরিচিত, একটি অস্বাভাবিক মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী। ১৯১৮ সালের জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর ১৯২০ অবধি এটি সেই সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ৫০ কোটি মানুষের মাঝে ছড়িয়েছিল। আনুমানিক ১.৭ থেকে ৫ কোটি বা কোন কোন হিসাবে ১০ কোটির মত মানুষ এতে মারা গিয়েছিল। যা এটিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারী হিসেবে সৃষ্টি করেছিল। কিছু গবেষক ভাইরাসটিকে বিশেষত মারাত্মক হিসাবে দেখিয়েছে কারণ এটি একটি সাইটোকাইন ঝড়কে ট্রিগার করে, যা তরুণ ও বয়স্কদের শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
স্প্যানিশ ফ্লুর প্রকৃত সূত্রপাতের স্থান নির্দিষ্টকরণে বিভিন্ন মতপার্থক্য রয়েছে।১৯৯৯ সালে ভাইরাসবিদ জন অক্সফোর্ডের (John Oxford)নেতৃত্বে একটি ব্রিটিশ দল প্রকাশ করেন যে ফ্রান্সের এটেপলসের (Étaples)যুক্তরাজ্যের প্রধান সেনা মঞ্চায়ন ও হাসপাতালের শিবিরটি স্প্যানিশ ফ্লুর কেন্দ্রস্থল। কেননা ১৯১৭ সালের শেষের দিকে, সামরিক রোগ বিশেষজ্ঞরা উচ্চ মৃত্যুর সাথে একটি নতুন রোগের সূত্রপাতের কথা জানিয়েছিলেন যা পরে ফ্লু হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিল। জনাকীর্ণ শিবির এবং হাসপাতাল শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আদর্শ স্থান ছিল। এই হাসপাতালটি হাজার হাজার রাসায়নিক হামলা এবং যুদ্ধের অন্যান্য হতাহতের শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিয়েছে এবং ১০০,০০০ সৈন্য প্রতিদিন শিবিরের মধ্য দিয়ে যেত। এছাড়া এখানে একটি শূকরশালা ছিল এবং আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে খাবারের জন্য নিয়মিত হাঁস-মুরগি সরবরাহ করত। অক্সফোর্ড এবং তার দল দাবি করে যে পাখিদের মধ্যে আশ্রয়কৃত উল্লেখযোগ্য পূর্ববর্তী ভাইরাসটি পরিবর্তিত হয়েছিল এবং তারপরে সামনের কাছাকাছি থাকা শূকরগুলিতে স্থানান্তরিত হয়ে এক পর্যায়ের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বিবৃতিতে মহামারীটির উৎস হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক আলফ্রেড ডব্লু ক্রসবি( Alfred W. Crosby)২০০৩ সালে বলেছিলেন যে ফ্লুটির উদ্ভব ক্যান্সাসে(Kansas) হয়েছিল এবং জনপ্রিয় লেখক জন এম ব্যারি (John M. Barry) তার ২০০৪ সালের এক নিবন্ধে ক্যানসাসের হ্যাসকলে একটি প্রাদুর্ভাবের বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে, পাস্তর ইনস্টিটিউটের ১৯১৮ ফ্লুতে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ক্লোড হ্যাননুন দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন যে পূর্ববর্তী ভাইরাস সম্ভবত চীন থেকে এসেছিল। এরপরে এটি যুক্তরাষ্ট্রে বোস্টনের কাছাকাছি পরিবর্তিত হয়েছিল এবং সেখান থেকে ফ্রান্সের ব্রিস্ট, ইউরোপের রণক্ষেত্র, ইউরোপ এবং বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং মিত্র সেনা ও নাবিকরা মূল বাহক হিসাবে কাজ করে। ২০১৪ সালে ঐতিহাসিক মার্ক হামফ্রিজ যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ এবং ফরাসী সীমায় কাজ করার জন্য ৯৬,০০০ চীনা শ্রমিককে জড়ো করা মহামারীর উৎস হতে পারে। তিনি কাগজপত্রে প্রমাণ পেয়েছিলেন যে ১৯১৭ সালের নভেম্বরে উত্তর চীনতে এক ধরণের শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা আঘাত হেনেছিল এবং এক বছর পরে চীনা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এটির আচরণকে স্প্যানিশ ফ্লুর অনুরূপ বলে নিরূপণ করেছিলেন। কিন্তু চীনা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ কথাটি পরিষ্কার করে উল্লেখ করে যে ১৯১৮ সালের ভাইরাসটি ইউরোপের চীনা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সৈন্য ও শ্রমিকদের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি । বরং মহামারী শুরু হওয়ার আগেই ইউরোপে এটি সংবহনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিকটতম মহল এবং বিশাল সেনা আন্দোলন মহামারীটি ত্বরান্বিত করেছিল এবং সম্ভবত উভয়ই সংক্রমণ বৃদ্ধি ও পরিবর্ধনকে উদ্দীপ্ত করেছিল। যুদ্ধের ফলে ভাইরাসের প্রাণঘাতীতাও বেড়ে গিয়েছিল। এই ফ্লু বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরার অন্যতম কারন ছিল ভ্রমণ বৃদ্ধি। আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় সৈন্য, নাবিক এবং বেসামরিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে এই রোগ আরও সহজে ছড়িয়ে পড়েছিল।১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে নিজের তত্ত্বাবধায় থাকা একাধিক রোগীর হটাৎ মৃত্যু লোকাল ডক্টর লরিং মিনারকে(Loring Miner) শঙ্কিত করে তুলে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পেরে লরিং অনতিবিলম্বে ইউএস পাবলিক স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের জার্নালে সতর্ক বাণী প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ৪ই মার্চ ১৯১৮ সালে ফোর্ট রাইলির(Fort Riley) ইউএসএর মিলিটারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ক্যাম্প হাস্কেল (Haskell) হতে বাবুর্চি এলবার্ট গীটচহেল(Albert Gitchell) অসুস্থতার রিপোর্ট করে, যা তাকে প্রথম ফ্লুয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির রেকর্ড হিসেবে উপস্থিত করে। কিছুদিনের মধ্যেই ক্যাম্পের ৫২২ জন অসুস্থতার রিপোর্ট করে এবং ৩৮ জন বা অধিক মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু আমেরিকান মিলিটারি সকল রিপোর্টকে সাধারণ অসুস্থতা বলে পাশ কাটিয়ে যায় ও কোনরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। তাদের কাছে ঘটনা টি স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। যার ফলস্বরূপ কোনো দ্বিতীয় চিন্তা ভাবনা না করেই হাস্কেল হতে আক্রান্ত সৈন্যদের আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ক্যাম্প ফুস্টন (fuston) ও পরবর্তীতে ফ্রান্সে স্থানান্তর করা হয়। কিছু সপ্তাহ পার হলে ক্যাম্প ফুস্টনের ১০% সৈন্য অসুস্থতার লক্ষণ দেখায়। আর এক মাসের মধ্যেই আমেরিকার প্রায় ২৪ টি বৃহৎ আর্মি ক্যাম্প হতে ফ্লুয়ের খবর পাওয়া যায়। তবুও মিলিটারি কেন্দ্র অনাগ্রহ দেখালে ১১ই মার্চ, ভাইরাসটি আমেরিকার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর নিউ ইয়র্ক সহ একাধিক প্রধান শহরাদি আক্রান্ত করে। অপরদিকে আগস্ট মাসের মধ্যে ফ্রান্সের ফ্রিটাউন ও সিয়েরা লিওনে ভাইরাসের সন্ধান মিলে । ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া আর্কাইভস আন্ড রেকর্ড সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় স্পেনের ৮০ শতাংশ মানুষ এইচ১এন১ ভাইরাসে অর্থাৎ স্প্যানিশ ফ্লুতে সংক্রমিত হয়। এটি ইউরোপ এবং এশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। নিউজিল্যান্ড হতে এইচ এম এস তাহিতি(HMS tahiti)ও এইচ এম এস মানতুয়া( HMS mantua) নামক দুটি ফ্লুতে আক্রান্ত জাহাজ আফ্রিকার দিকে গমন করে এবং সেখানেও প্লেগ ছড়িয়ে দেয়।
কিন্তু সময়টি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তাই যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ বহু দেশ সৈন্য ও সাধারণ নাগরিকদের মনোদল রক্ষার্থে ও যুদ্ধের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে নিজ দেশের যাবতীয় সংবাদ মাধ্যমে ফ্লুয়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাস্তবতার তুলনায় অধিক কম প্রকাশ করতো। কিন্তু সে সময়ে যুদ্ধ নিরপেক্ষ দেশ স্পেনের সংবাদে কোনো প্রকার সেনসর্শিপের প্রয়োজন ছিল না বলে ফ্লু হয়ে উঠেছিল তৎকালীন স্পেনের সবচেয়ে নজরকাড়া খবর। এর আন্তর্জাতিক সাড়া মিলে যখন স্প্যানিশ রাজা কিং আলফানসোর মারাত্মক অসুস্থতার সংবাদ প্রকাশিত করা হয়। স্পেনের এহেন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশের সংবাদ মাধ্যম ফ্লু স্পেন থেকে আসা বলে বানোয়াট দাবি করে যা মহামারীটির ডাকনাম, “স্প্যানিশ ফ্লু” এর জন্ম দেয়। মূলত ১৯১৮ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স থেকে স্পেনে চলে আসার পর মহামারীটি ব্যাপকভাবে প্রেসের নজরে আসে।
এ দিকে আমেরিকান হেলথ এসোসিয়েশনের(american health association) প্রধান ডক্টর উইলিয়াম এইচ ওয়েলচ (William H Welch) ওয়াশিংটন ডিসিতে ফ্লুয়ের কারণে মহামারীর আগাম চিন্হ খুঁজে পাচ্ছিলেন। এর আগেও সৈন্য স্থানান্তর করা প্রসঙ্গে তিনি আমেরিকার মিলিটারি বিভাগের স্বাস্থ্য প্রধান সার্জেন্ট জেনারেল গর্গেসকে প্লেগ হওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু গর্গেসের প্রস্তাবে মিলিটারির কোনো সাড়া না পেলে উইলিয়াম ডক্টর এভেরি সহ নিজ থেকেই বহু সংখক গবেষক ও ডাক্তার চারদিকে নিয়োগ দিলেন। এ ছাড়াও নিউ ইয়র্ক থেকে বিখ্যাত ডক্টর পার্ক ও আনা উইলিয়াম ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন তৈরিতে এগিয়ে আসেন। প্রতিটি শহরে স্প্যানিশ ফ্লু হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাস্ক পরিধান ও এক স্থানে জমা হওয়া হতে বিরত থাকার মত বিভিন্ন সতর্কবাণী পৌছিয়ে দেয়া হয়।

Spanish flu-1918 – Source-medium.com

কিন্তু সকল সতর্ক অগ্রাহ্য করে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহর কর্তৃপক্ষ লিবার্টি লোন প্যারেডের আয়োজন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তহবিল সংগ্রহে সরকারি বন্ড বিক্রির প্রচারণার অংশ হিসেবে এ প্যারেডের আয়োজন করা হয়। অথচ ওই সময় স্প্যানিশ ফ্লুর কারণে ১৭ লাখ জনসংখ্যার শহরটি তখন ভয়ঙ্কর মহামারি ঝুঁকিতে। মূলত ফিলাডেলফিয়ার নেভি ইয়ার্ডের মাধ্যমে ফিলাডেলফিয়াতে ভাইরাসটির বিস্তার ঘটে সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখে। । মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ৬০০ নৌসেনা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। কিন্তু এরপরও ফিলাডেলফিয়া কর্তৃপক্ষ লিবার্টি লোন প্যারেড বাতিল করেনি। প্রথম আক্রান্ত শনাক্তের এক সপ্তাহ বা কিছু সময় পরই এটি আয়োজন করা হয় এবং তারা ২৮ সেপ্টেম্বর আয়োজিত প্যারেডে ২ লাখ মানুষ জড়ো করে।
এর ফলাফল হয় মারাত্মক। ১ অক্টোবর ফিলাডেলফিয়াতে নতুন করে ৬৩৫ জন স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ফিলাডেলফিয়া। মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে এখানে ১২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। আক্রান্ত হয় প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ। ছয় মাসের মধ্যে মহামারিতে মারা যায় প্রায় ১৬ হাজার এবং আক্রান্ত হয় ৫ লাখের বেশি মানুষ।
গোটা বিশ্বের পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। মহামারীর কারণে মৃতের সংখ্যা এত বেশি দাঁড়াচ্ছিলো যে এক পর্যায়ে একাধিক অঞ্চলে কফিনের স্বল্পতা দেখা দেয়। আতঙ্ক ও সংবাদ মাধ্যমের সেন্সর করা খবরের কারনে তৈরি অনিশ্চয়তা যেন প্লেগে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাধারণ নাগরিক ও সৈন্যদের মৃতের হার ক্রমাগত বাড়তে থাকলে অবশেষে এক পর্যায়ে আমেরিকান কেন্দ্রীয় মিলিটারি শঙ্কিত হয়ে পড়ে ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।
এ দিকে ২৭ সেপ্টেম্বর ভাইরাসের উপর গবেষণায় নিজ রিপোর্ট প্রকাশ করার পর আটলান্টিক হোটেলে অবস্থানকালে ডক্টর উইলিয়াম ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তার জায়গায় ভিক্টর ভাউগহান (victor vaughan) এগিয়ে আসেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ডক্টর পার্ক ও ডক্টর আনা ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিন তৈরিতে স্যক্ষম হন। কিন্তু ভাইরাসের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের কারণে তা কোনো উন্নতি আনতে পারে নি। ডক্টর পার্ক ও ডক্টর আনা ব্যর্থ হলে ডক্টর এভেরি ফ্লু রোধ করতে এক প্রকার ভ্যাকসিন তৈরি করেন যা গুরুতরদের বাঁচাতে না পারলেও প্রথম পর্যায়ে থাকা রোগীদের সুস্থ করতে সক্ষম হয়। আবার সার্জারির দিক থেকে ডাক্তার রা নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে স্প্যানিশ ফ্লু হতে একাধিক রোগীর জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়। মহামারীর কারণে মিলিটারি কর্তৃক সৈন্য পাঠানো ও যাবতীয় যুদ্ধ সম্পূর্ণ রূপে ১৯১৮ সালের নভেম্বরে বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হয়। পরিপূর্ণ ভাবে চলে না গেলেও এক পর্যায়ে স্প্যানিশ ফ্লু ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে এবং সময়ের আবর্তনে তার ইতিও ঘটে। কিন্তু কেন স্প্যানিশ ফ্লু হটাৎ এভাবেই চলে যায় সে প্রসঙ্গে আজও কোনো সঠিক বাখ্যা গবেষকগণ খুঁজে পান নি।
ফ্লু চলে গেলেও তার পিছনে ফেলে আসা ক্ষতচিহ্ন ভুলে যাওয়া সম্ভবপর নয়।কেননা এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ইন্দোনেশিয়ায় ৪,০০০,০০০ , রাশিয়ায় ১,০০০,০০০ , ফ্রান্সে ২০০,০০০ , জাপানে ৩৯০,০০০ , যুক্তরাজ্যে ২২০,০০০ , যুক্তরাষ্ট্রে ৬৭৫,০০০ ও ফিলাডেলফিয়ায় ১৬,০০০ জন মারা যায়। কিন্তু প্রকৃতির এই নিধনযজ্ঞের কেন্দ্রে ছিল ভারতবর্ষ, প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ থেকে ২ কোটি মানুষ, এমনকি সেকালের ভারতীয় নেতা মহাত্মা গান্ধীও আক্রান্ত হন ও কোনোমতে তা হতে বেঁচে আসেন। দুটি ধাপে ভারতকে গ্রাস করে স্প্যানিশ ফ্লু – প্রথম ধাপে এর প্রভাব ছিল অপেক্ষাকৃত মৃদু, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে সারা দেশে আছড়ে পড়ে মহামারী, ১৯১৮ সালের অন্তিম ভাগে। মনে করা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরতে থাকা সৈনিকদের হাত ধরেই ভারতে প্রবেশ করে স্প্যানিশ ফ্লু। বর্তমান প্রেক্ষিতে স্প্যানিশ ফ্লু হতে শিক্ষণীয় হলো ১৯১৮-র মহামারীর মতো প্রেক্ষাপট তৈরি হলে, দেশের যে অঞ্চল দিয়ে মরণ জীবাণুর প্রবেশ ঘটেছে, তার সংলগ্ন এলাকাগুলিকে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নিতে হবে, যার ফলে স্বল্পমেয়াদী কিন্তু তীব্র প্রকোপের মোকাবিলা করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। তবে মহামারীর মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপও হতে হবে দীর্ঘকালীন। স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী থেকে আরও একটি জরুরি শিক্ষা সম্পর্কে প্রফেসর চন্দ্র বলেছেন, “আমরা দেখেছি, রোগ যত ছড়িয়েছে, ততই মৃত্যুর হার কমেছে, এবং তা যদি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ফলেই সত্যিই হয়ে থাকে, তবে আমাদের পক্ষে তা অত্যন্ত বেশি রকমের শিক্ষণীয়। তাই পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ফাতিমা বিনতে মুস্তাফিজ ( নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর )

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button