জীবনীসাম্প্রতিক

ইরফান খানের জীবনী এবং তার আলোচিত অভিনয় জীবনের উপাখ্যান

হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম ইরফান খান। বলিউডে যিনি সাহেবজাদা নামেও পরিচিত। হিন্দি সিনেমা ছাড়াও অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ, হলিউড, তেলেগু ও বাংলা সিনেমায়। যার অতুলনীয় ও অকল্পনীয় অভিনয়ে মুগ্ধ হত দুই বাংলার দর্শকরা। চলচ্চিত্র সমালোচক, সমসাময়িক অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী বলে গণ্য করে থাকেন।
১৯৬৭ সালের ৭ জানুয়ারি ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পাঠান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বলিউড কাঁপানো অভিনেতা ইরফান খান। পরিবার থেকে তার নাম রাখা হয় সাহেবজাদা ইরফান আলী খান। ইরফানের মাতা বেগম খান এবং বাবা জাগিরদার খান। ইরফানের বাবা ছিলেন স্থানীয় পাগড়ি ব্যবসায়ী। ইচ্ছে ছিল ক্রিকেটার হবেন। ক্রিকেটটা বেশ ভালই খেলতেন। ডাক পান ভারতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ভিত্তি হিসেবে সুপরিচিত সিকে নায়ুডু টুর্নামেন্টে অনুর্ধ্ব ২৩ দলে। কিন্তু আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে ইরফানের আর ক্রিকেট খেলা হলো না। স্থির করেন ব্যবসা করবেন। কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হলেন।
এরপর ইরফান ভর্তি হন এমএ কোর্সে। এমএ পড়ার সময়েই ১৯৮৪ সালে হাতে আসে স্কলারশিপ।যার মাধ্যমে তিনি দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় পড়ার সুযোগ পান। এনএসডি থেকে ড্রামাটিক আর্টসে ডিপ্লোমা করেন ইরফান। ডিপ্লোমা শেষ করে মুম্বাইয়ে পাঁড়ি জমান তিনি। সেখানে ‘চাণক্য’, ‘সারা জাহাঁ হামারা’, ‘বনেগি আপনি বাত’ ও ‘চন্দ্রকান্তা’-র মতো টেলিভিশন সিরিয়ালে অভিনয় করেন ইরফান।     অভিনয় করেছেন দূরদর্শন এবং স্টার প্লাসের মত বড় বড় টিভির সিরিয়ালে। স্টার প্লাসের দর টিভি ধারাবাহিকে প্রধান খলচরিত্রে অভিনয় করেন ইরফান।এছাড়া তিনি সেট ইন্ডিয়ায় প্রচারিত ভানবর ধারাবাহিকের দুটি পর্বে অভিনয় করেন। এভাবেই মুম্বাইয়ে থিয়েটার আর টিভি সিরিয়ালের মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। মুম্বাইয়ে তিনি টিউশনি করিয়ে এবং মানুষের বাসায় এসি ঠিক করে নিজের খরচ জোগাড় করতেন। 
১৯৮৮ সালে ইরফান খানের ক্যারিয়ারে যোগ হয় নতুন মাত্রা। মীরা নায়ার পরিচালিত, একাডেমি পুরস্কার মনোনীত হিন্দি চলচ্চিত্র সালাম বম্বেতে প্রথম অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সিনেমায় পদার্পণ করেন।  সালাম বম্বেতে অভিনয় করলেও দূর্ভাগ্যবশত তার অভিনিত অংশটি সিনেমা থেকে বাদ পড়ে। তারপরও তিনি দমে যাননি। এগিয়ে যেতে থাকেন আপন উদ্যমে। ৯০ এর দশকে তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উপহার দেন। তন্মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো এক ডক্টর কি মউত এবং সাচ আ লং জার্নি ।
এরপর তার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র দর্শকমহলে ব্যর্থ হয়। কিন্তু তাতেও তিনি থেমে থাকেননি। একের পর এক ভিন্নধর্মী সিনেমা করার চেষ্টা চালিয়ে যান। ইরফান। কিন্তু আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই বেশি হয়েছিল তার এসব সিনেমা গুলোর জন্য। পরবর্তীতে ২০০১ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ডিরেক্টর আসিফ কাপাডিয়া ইরফানকে তার “দ্য ওয়ারিয়র” সিনেমার প্রধান চরিত্রের জন্য মনোনীত করলেন। ২০০১ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে মুক্তি পায় দ্য ওয়ারিয়র সিনেমাটি। অস্কারের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে যে সিনেমাটি পাঠানো হবে, তার সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও এই সিনেমাটি জায়গা পেয়েছিল। আর এই সিনেমার হাত ধরে চলচ্চিত্র মহলে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন ইরফান। ২০০৩-এ শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ অবলম্বনে মকবুল সিনেমায় নামভূমিকায় অভিনয় করেন ইরফান।
২০০৪ এ খান রোড টু লাদাখ নামে একটি শর্টফিল্মে অভিনয় করেন ইরফান। পরবর্তীতে এই শর্টফিল্মের পরিচালক একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করেন।যেখানে প্রধান চরিত্রে ছিলেন ইরফান খান। ২০০৪ সালে বলিউডে হাসিল নামের আরেকটি সিনেমায় ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেন ইরফান। সিনেমাটিতে তার অভিনয়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায় সমালোচক মহল। হাসিল সিনেমার জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা ভিলেনের পুরস্কার জিতে নেন।
২০০৫ সালে রোগ সিনেমায় বলিউডে তাঁকে প্রথমবার মুখ্য চরিত্রে দেখা যায়। এরপর বলিউডের একের পর এক সিনেমায় হয় তাঁকে প্রধান বা পার্শ্ব চরিত্র বা ভিলেনের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। সিনেমাটিতে ইরফানের অভিনয় দেখে স্ম্যাশহিটস লিখেন- “ইরফানের চোখ তার শব্দের চেয়েও জোড়ে কথা বলে “। ইরফান খান ২০০৬ সালে দ্য নেমসেক চলচ্চিত্রে তাবুর বিপরীতে অভিনয় করেন।২০০৭ সালে অনুরাগ বসুর লাইফ ইন আ মেট্রো সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। বক্সঅফিসে হিট মেট্রো সিনেমার জন্য ফিল্মফেয়ার বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টরের পুরস্কার পেয়েছিলেন ইরফান।  তাঁকে আ মাইটি হার্ট ও দ্য দার্জিলিং লিমিটেড-এর মতো আন্তর্জাতিক সিনেমাতেও দেখা গিয়েছে।
২০০৮ সালে একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র স্লামডগ মিলিয়নিয়ার চলচ্চিত্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় ইরফানকে। স্লামডগ সিনেমাটি ৮টি ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে নেয়।। এই সিনেমার জন্য তিনি এবং সিনেমার অভিনেতারা স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং পারফর্মেন্স বাই আ কাস্ট ইন আ মোশান পিকচার অ্যাওয়ার্ড জয় করেন।স্লামডগের পরিচালক ইরফানের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন “ইরফান একই অভিনয় বারবার একইরকম নিখুঁতভাবে করতে পারেন। এটা দেখতে পারা সত্যিই অসাধারণ।” 
২০০৯ সালে মারপিটধর্মী এসিড ফ্যাক্টরি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় ইরফানকে। সে বছরই ইরফান নিউইয়র্ক এবং আই লাভ ইউ নামের দুটি বিখ্যাত সিনেমায় অভিনয় করেছেন। নিউইয়র্ক সিনেমায় তার চরিত্র ছিল এফবি আই এজেন্ট।
২০১১ সালে ইরফান খান পান সিং তোমার সিনেমায় অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। ২০১২ সালে ইরফান খান দি অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান এবং লাইফ অব পাই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।  ২০১৩ সালে তার দ্য লাঞ্চবক্স সিনেমাটি সমালোচক ও দর্শকদের দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এই সিনেমার জন্য এশিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে ইরফান গুন্ডে সিনেমায় অভিনয় করেন।সে বছরই তার আরো দুটি চলচ্চিত্র হলো দ্য এক্সপোজ ও হাইদার।
২০১৫ সালে অমিতাভ বচ্চন ও দীপিকা পাড়ুকোনের সাথে পিকু সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ইরফান খান। সিনেমাটি বক্স অফিসে ১৪১ কোটি রুপির ব্যবসা করে।২০১৫ সালে জুরাসিক ওয়ার্ল্ড নামের হলিউডের সিনেমাটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন ইরফান খান। সেই বছরই ঐশ্বরিয়া রায়ের সাথে জাজবা নামের একটি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন। 
তার অভিনীত সর্বোচ্চ আয়কারী হিন্দি চলচ্চিত্র হল হাস্যরসাত্মক নাট্যধর্মী হিন্দি মিডিয়াম। ২০১৭ সালের এই মুভিটি ভারত ও চীনে স্লিপার হিট তকমা লাভ করে। এছাড়া ইরফানের অভিনীত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র হল জুরাসিক ওয়ার্ল্ড , ইনফার্নো ইত্যাদি।  ভারতের এই খ্যাতনামা অভিনেতা অভিনয় করেছিলেন বাংলা সিনেমাতেও। মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী পরিচালিত ইরফান খান অভিনিত বাংলা সিনেমা “ডুব” মুক্তি পেয়েছিল ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বরে। ইরফান খান অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র হলো আংরেজি মিডিয়াম। সিনেমাটি এ বছরই মুক্তি পেয়েছে। 
১৯৯৫ সালের  ২৩ ফেব্রুয়ারী লেখিকা এবং ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার স্নাতক সুতপা শিকদারের সাথে ইরফান খানের বাগদান সম্পন্ন হয়। বাবলি এবং অয়ন নামে তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। স্ত্রী সুতপা তার সম্বন্ধে বলেন ব্যক্তিগত জীবনে অভিনয়ের পাশাপাশি বই পড়তে ভালবাসতেন ইরফান। রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে থেকে অভিনয় চর্চা করতেন তিনি।
দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়েও এক গাল হাসি নিয়ে জীবনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বসেছিলেন তিনি।২০১৮ সালে বিরল ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও হার মানেননি। বরং আরও বেশি করে জীবনকে আঁকড়ে ধরেছিলেন ইরফান খান। আর এই লড়াইয়ে পাশে পেয়েছিলেন স্ত্রী ও পরিবারকে। গত সপ্তাহেই প্রয়াত হয়েছেন ইরফানের মা সায়েদা বেগম। লকডাউনের কারণে জয়পুরে মায়ের শেষকৃত্যে যোগ দিতে পারেননি ইরফান। স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় কয়েকদিন আগে তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। ২৯ এপ্রিল ২০২০ এ  মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি  অভিনেতা। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে পাড়ি জমালেন ওপারে।  বর্ষীয়ান এই অভিনেতার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বলিউড পাড়ায়।
Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button